ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 2

কর বিরোধ ঝুলিয়ে রাখাকে ড. ইউনূসের ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ বলছেন হাইকোর্ট

0

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আয়কর আদায়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাঁচ করবর্ষের আয়কর পুনর্নির্ধারণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটির করা পৃথক দুটি রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত করসংক্রান্ত একটি নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাকে ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের নিজের আয়কর পরিশোধের দায় রয়েছে। গ্রামীণ টেলিকমের দেওয়া উৎসে করকে গ্রামীণ কল্যাণের নিজের কর পরিশোধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
রায়ের দুটি অনুলিপির একটি ১৫ পৃষ্ঠা, অন্যটি ৩২ পৃষ্ঠার। এতে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষকে বকেয়া কর আদায়ে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি রায়ে দ্রুত বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং অন্যটিতে প্রয়োজনীয় দাবিনামা নোটিশ জারির মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পাঁচ করবর্ষের কর নিয়ে বিরোধ:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পুনর্মূল্যায়নের পর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর দাবি করা হয়। এই দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
মামলার মূল বিরোধ গ্রামীণ কল্যাণের আয় এবং গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিপরীতে আয়কর পরিশোধের দায় নিয়ে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি আর্থিক চুক্তি ছিল। ওই চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণফোনের শেয়ার কিনেছিল। এর বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণ কল্যাণকে লভ্যাংশ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
এনবিআরের পুনর্মূল্যায়নে ওই আয় এবং তার বিপরীতে কর পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় আসে। কর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আয়কে ভিত্তি করে নতুন করে কর নির্ধারণ করে। এরপর কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয় গ্রামীণ কল্যাণ।
আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারার ব্যাখ্যা:
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১৭৩ ধারার কথা উল্লেখ করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই ধারায় কর কমিশনারকে পূর্ববর্তী আদেশে ভুল সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যথাযথ নোটিশ দেওয়া এবং করদাতাকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার পর কমিশনার সংশোধিত আদেশ দেন।


আদালত আরও উল্লেখ করেন, শুনানির সময় গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর আয়কর রিটার্নের বিপরীতে প্রদেয় কর পরিশোধের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
আদালতের যুক্তি হলো, গ্রামীণ টেলিকমের পক্ষ থেকে কর কর্তন বা পরিশোধ করা হয়ে থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রামীণ কল্যাণের নিজস্ব আয়কর পরিশোধের প্রমাণ হয়ে যায় না। দুই প্রতিষ্ঠানের করদায় এবং সংশ্লিষ্ট আয়ের হিসাব পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানের পর্যবেক্ষণ:
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত গ্রামীণ কল্যাণের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই ধরনের করসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক সময়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেছেন, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ করবর্ষের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অনুরূপ কর পরিশোধ করেছিল এবং পরে এ বিষয়ে করা পৃথক একটি মামলা প্রত্যাহার করেছিল।
আদালতের মতে, আগে নিষ্পত্তি হওয়া বা নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণেই আদালত বিরোধটিকে ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নির্দিষ্ট কর বিরোধ ও সংশ্লিষ্ট রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে দেওয়া। একে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত আয়করসংক্রান্ত কোনো পৃথক ফৌজদারি দণ্ডাদেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের রায় প্রত্যাহারের পর নতুন করে শুনানি:
এ মামলায় এর আগেও হাইকোর্টে রায় হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে ওই বেঞ্চের একজন বিচারপতি সংশ্লিষ্ট মামলায় আগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেছিলেন—এমন বিষয় সামনে আসার পর ২৯ আগস্ট ২০২৪ ওই রায় প্রত্যাহার করা হয়। মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে নতুন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য পাঠানো হয়। শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ পৃথক দুটি রিটের রুল খারিজ করে দেন। এর ফলে এনবিআরের পুনর্নির্ধারিত কর দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের চ্যালেঞ্জ সফল হয়নি।
আপিলের সুযোগ থাকছে:
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আইন অনুযায়ী আপিলের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তারা জানিয়েছে।
এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। তবে সে পর্যায়ে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আপিলের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইনগতভাবে, হাইকোর্টের রায় বর্তমানে বহাল থাকায় এনবিআরকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আপিল বিভাগে পরবর্তী কোনো আদেশ বা রায় এলে মামলার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।

আবাসন খাতে স্থবিরতা; ঝুঁকিতে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ

 

দেশের আবাসন খাতে একদিকে নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে উচ্চ সুদে গৃহঋণ ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকট—সব মিলিয়ে গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা বাড়ার পাশাপাশি চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও থমকে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে, সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ পরিস্থিতিতে আবাসন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশে নামানো, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। তাঁর আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল আবাসন খাতের বর্তমান সংকট, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন সহজলভ্য করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, আবাসনকে কেবল ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ক্রেতারা কয়েক বছর আগে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেন এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। চুক্তি করার পর নির্মাণসামগ্রীর দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকে। এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কিছু আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন এ ধরনের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। এরই মধ্যে কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমেছে।
ফ্ল্যাটের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, মানুষের ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।
তিনি বলেন, উচ্চ সুদে গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
ড. আলী আফজালের ভাষ্য, করোনাকাল থেকেই আবাসন খাতের সংকট বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগ করা অর্থ এবং অর্জিত মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আবাসন খাতের সংকট শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা বা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প জড়িত বলে জানান রিহ্যাব সভাপতি। এসব শিল্পের পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতা আবাসন খাত। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব পণ্যের চাহিদা ও বিক্রিও কমে যায়।
তিনি বলেন, নির্মাণ কার্যক্রম সংকুচিত হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন ও বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হতে পারে। এভাবে আবাসন খাতের মন্দা বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
ড. আলী আফজালের দাবি, দেশের আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়া ও নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই বলে জানান তিনি।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর ও ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে এই অতিরিক্ত অর্থ যোগ হওয়ায় অনেক ক্রেতার জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেন। প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন রিহ্যাব সভাপতি। জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়, যার চূড়ান্ত চাপ বহন করতে হয় ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের।
মধ্যবিত্তের আবাসন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণের সুদ কমানো গেলে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য বাড়বে এবং আবাসন খাতেও নতুন করে চাহিদা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে আরও কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির সময়ে স্বল্প সুদে অর্থায়ন পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান প্রকল্প শেষ করতে এবং নতুন প্রকল্প হাতে নিতে উৎসাহিত হবে।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ খাতকে শুধু মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে নীতিসহায়তা দেওয়া উচিত।

সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, নতুন আবাসন গড়ে তুলতে নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অব্যবহৃত সরকারি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি জমি ব্যবহারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও বিনিয়োগ যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক আবাসন পরিকল্পনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। কর্মস্থলে যাতায়াতের সুবিধা বাড়লে ঢাকার বাইরে বসবাসের আগ্রহ বাড়বে এবং রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কমতে পারে।
আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে সরকারের কার্যকরভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের বিষয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুফল প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নির্মাণ ব্যয়, গৃহঋণের সুদ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয়—এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
রিহ্যাব সভাপতির মতে, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন। পরিকল্পিত নীতিসহায়তা ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের মাধ্যমে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজারে চাহিদা বাড়বে, সংযুক্ত শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

সংবিধান বাতিল করে ক্ষমতা দখল: পাকিস্তানের অন্ধকার অধ্যায়ের শুরু যেখান থেকে

0

 

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংবিধান বাতিল, রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার এবং সেনাবাহিনীর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক যাত্রা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ইস্কান্দার মির্জার ঘোষিত সামরিক শাসন শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ক্ষমতাকেই কেড়ে নেয়। আর জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায় দীর্ঘ এক সামরিক কর্তৃত্বের ধারা, যার প্রভাব দেশটির রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামোয় সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১ বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নেমে আসে বড় বিপর্যয়। প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল করেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং সামরিক আইন জারি করেন। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বহু রাজনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এভাবেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাবনা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়।
এই ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায় মির্জার সহযোগী ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। পরবর্তী সময়ে নিজের স্মৃতিকথায় আইয়ুব জানান, ১৯৫৪ সাল থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অংশ হয়ে উঠেছিল। তখন তিনি সেনাপ্রধানের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনীতিকদের প্রতি মির্জা ও আইয়ুব—দুজনেরই ছিল অবজ্ঞার মনোভাব।
১৯৫৯ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই নির্বাচন দেশটিকে প্রতিবেশী ভারতের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারত। কিন্তু ক্ষমতালোভী মির্জা ও আইয়ুব রাজনীতিকদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় নয় বছর পর, ১৯৫৬ সালে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খুরোসহ দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার প্রচেষ্টায় একটি সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। সেই সংবিধানের মধ্য দিয়েই সংসদীয় সরকারব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়।
এর আগে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধারার আদলে প্রণীত ওই সংবিধানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
কিন্তু ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মির্জা নিজেই সেই সংবিধান বাতিল করেন, যে সংবিধানের ভিত্তিতে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা, দর-কষাকষি ও সমঝোতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সাংবিধানিক কাঠামো এক ঘোষণাতেই ভেঙে পড়ে।
সামরিক আইন জারির পর ইস্কান্দার মির্জা জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল ক্ষমতার এক নির্মম পরিহাস। নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে গিয়ে মির্জা এমন একজন সেনাপ্রধানকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, যিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন।
মির্জা ও আইয়ুব—দুজনই ছিলেন ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে দক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত আইয়ুবের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলের কাছে মির্জা পরাজিত হন।
সামরিক শাসন জারির পর মির্জা একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। সেই মন্ত্রিসভায় স্থান পান লারকানার বিদেশে শিক্ষিত তরুণ আইনজীবী জুলফিকার আলী ভুট্টো। মির্জার ছেলে হুমায়ুন মির্জার বন্ধু ভুট্টো মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্টকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি এমন মন্তব্যও করেছিলেন, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর ধারণা ছিল, ইতিহাসে মির্জাকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়েও মহান ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হবে।
কিন্তু সামরিক শাসন ঘোষণার পরের ২০ দিন মির্জা ও আইয়ুবের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। আইয়ুব যে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আইয়ুব ও তাঁর অনুগত কর্মকর্তারা মির্জাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কতটা অজ্ঞ ছিলেন, তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রকাশ পায়।
জেনারেল বুরকি, কে এম শেখ, মুসা ও ইয়াহিয়া খানসহ আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, একই রাষ্ট্রে দুজনের হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে না। ফলে মির্জাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে করাচিতে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইয়াহিয়া খানও। সেখানে মির্জাকে বন্দুকের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তাঁকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদ মির্জাসহ বিমানে করে কোয়েটায় পাঠানো হয়। নাহিদ এর আগে তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত একজন ইরানি নৌ-কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন। কয়েক দিন পর মির্জা ও নাহিদকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের বাকি সময় তিনি বিদেশেই কাটান; পাকিস্তানে আর ফিরতে পারেননি। ২৭ অক্টোবর থেকে পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চলে আসে আইয়ুব খানের হাতে। তিনি একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য ছিল, যদিও কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকেও রাখা হয়েছিল। তরুণ ভুট্টোও দ্রুত নিজের অবস্থান পাল্টে আইয়ুবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তার প্রাথমিক ইঙ্গিত এই ঘটনাতেই দেখা যায়।
আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের বিচার বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনিরের নেতৃত্বাধীন উচ্চ আদালত ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ বা ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগ করে সামরিক শাসন ও ক্ষমতা দখলকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করে। এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পক্ষে একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

বিচারপতি মুনির এর আগেও একই ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। ১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দিলে স্পিকার মৌলভি তমিজউদ্দিন খান এর বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু মুনিরের নেতৃত্বাধীন আদালত সেই চ্যালেঞ্জ খারিজ করে দেয়। তখনও ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়েছিল।
চার বছর পর আইয়ুবের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রেও একই বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়। মুনির আইয়ুবের ক্ষমতা গ্রহণকে ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল এবং ওই বিপ্লবগুলোর ঐতিহাসিক চরিত্র এক ছিল না। ফলে বিচার বিভাগের এই অবস্থান সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে সামরিক কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে।
ক্ষমতায় বসেই আইয়ুব খান পাকিস্তানকে নিজের রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত করেন। ১৯৫৯ সালে তাঁর সরকার ইলেকটিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডিন্যান্স বা ইবিডিও জারি করে। এর মাধ্যমে রাজনীতিকদের একটি বড় অংশকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কোনো যুদ্ধে বিশেষ বীরত্ব প্রদর্শনের প্রেক্ষাপট ছাড়াই আইয়ুব নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন। তাঁর শাসনের প্রথম চার বছর পাকিস্তান সরাসরি সামরিক আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।
১৯৬২ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নতুন সংবিধানের মাধ্যমে আইয়ুব নিজের ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। সর্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে মাত্র ৮০ হাজার সদস্যের একটি নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।
এই নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যদের বলা হতো ‘বেসিক ডেমোক্র্যাটস’। তাঁরাই প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাচনে অংশ নিতেন। পাকিস্তানে একটি জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি প্রাদেশিক পরিষদ গঠন করা হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা সীমিত ছিল। গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।
ফলে প্রাদেশিক প্রশাসনও আইয়ুবের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানে জেনারেল আজম খান ও গোলাম ফারুকের মতো ব্যক্তিদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন আবদুল মোনেম খান। তিনি ছিলেন স্বল্পপরিচিত বাঙালি আইনজীবী এবং আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। পশ্চিম পাকিস্তানে কালাবাগের নবাব মালিক আমির মোহাম্মদ খান বেশ কয়েক বছর গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসর নেওয়া জেনারেল মোহাম্মদ মুসা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তী সময়ে নবাবকে তাঁর এক ছেলে হত্যা করেন। ঘটনাটি পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে প্রচার করা হয়েছিল।
বেসামরিক রাজনীতিকের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় আইয়ুব খান মুসলিম লীগকে বিভক্ত করেন। দলটির একটি অংশকে নিয়ে তিনি গঠন করেন কনভেনশন মুসলিম লীগ। এর মাধ্যমে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
আইয়ুবের শাসনের দশ বছরে পাকিস্তানে এমন একটি বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। প্রশাসনের একাংশ এবং সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের তোষামোদও তাঁর শাসনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে। তাঁর স্মৃতিকথা ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বা ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ অন্যের হাতে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
১৯৬৩ সালে মোহাম্মদ আলী বগরার মৃত্যুর পর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আইয়ুব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত ঘটতে থাকে।
১৯৬৫ সালে আইয়ুব ও ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের পরিণতিতে দুই দেশই চাপে পড়ে এবং ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে আইয়ুব খান তাসখন্দ ঘোষণা প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষর করেন।
কিন্তু এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়। ভুট্টো ঘোষণাটিতে একটি ‘গোপন ধারা’ রয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সরকার থেকে বেরিয়ে আসেন এবং একসময় যাঁর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর উত্থান ঘটেছিল, সেই আইয়ুব খানের বিরুদ্ধেই প্রচার শুরু করেন।
ভুট্টোর এই অবস্থান পরিবর্তন পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আইয়ুবের মন্ত্রিসভায় তাঁর প্রবেশ যেমন ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্যের পরিচয় বহন করেছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে সরকারের বিরোধিতা তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ প্রশস্ত করে।
আইয়ুব খানের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় শাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন।
শেখ মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। সরকারের লক্ষ্য ছিল, এই মামলার মাধ্যমে মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেওয়া এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা।
কিন্তু ফল হয় উল্টো। আগরতলা মামলা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দেয়। শেখ মুজিবের প্রতি জনসমর্থন বাড়তে থাকে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। যে মামলা দিয়ে তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তাঁর পতনের পথ তৈরি করে।
আইয়ুবের সমর্থকেরা তাঁকে এশিয়ার চার্লস দ্য গলের সমতুল্য নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইতেন। তাঁর শাসনকালকে বলা হতো ‘উন্নয়নের দশক’। কিন্তু উন্নয়নের এই প্রচারণার আড়ালে দুই পাকিস্তানেই গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তাঁর শাসনের গ্রহণযোগ্যতাকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়। ১৯৬৯ সালের শুরুতে আইয়ুব খান গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে তিনি বাধ্য হন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর আগে খান আবদুল ওয়ালি খান ও ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলনের চাপে তাঁদেরও মুক্তি দিতে হয়।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুবের শাসনব্যবস্থা গণআন্দোলনের মুখে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
১৯৬৯ সালের মার্চে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও তিনি গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি। ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের স্পিকার আবদুল জব্বার খানের হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব যাওয়ার কথা থাকলেও আইয়ুব সেই পথ অনুসরণ করেননি। পরিবর্তে তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আবার সামরিক আইন জারি করেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এক সামরিক শাসকের বিদায়ের পর আরেক সামরিক শাসকের আগমন প্রমাণ করে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের মূলে ছিল শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা।
ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। মির্জা লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। সেখানে তাঁকে শেষ পর্যন্ত একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপকের কাজ করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
১৯৬৯ সালের নভেম্বরে লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া খান তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত করার অনুমতি দেননি। ফলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে তেহরানে দাফন করেন।

অন্যদিকে, ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে আইয়ুব খান মারা যান অনেকটা বিস্মৃত ও উপেক্ষিত অবস্থায়। যে ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতাও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্থায়ী করতে পারেনি।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরের সামরিক অভ্যুত্থান পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতার সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে দেশটি আরও তিন দফা সামরিক শাসনের মুখোমুখি হয়—জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল জিয়াউল হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে।
আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের দুই বছর পর নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জেনারেল আসিম মুনিরকে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট বেসামরিক সরকারের উদ্যোগে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়েছে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে বারবার সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ, সংবিধানের স্থগিতকরণ এবং বেসামরিক রাজনীতির ওপর হস্তক্ষেপ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করলে তা কি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে?

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি দেখায়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে ক্ষমতা সংহত করা সম্ভব হলেও তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক শাসন ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকারকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাস সেই সংকটেরই ধারাবাহিক প্রতিফলন।

আইসিসিবিতে সুপার সেল কার বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ঢল

0

 

রাজধানীতে টানা বৃষ্টির মধ্যেও থেমে থাকেনি গাড়ি কেনাবেচার আয়োজন। ক্রেতা-বিক্রেতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) এক্সপো ভিলেজে জমে উঠেছে সুপার সেল কার বাজার। প্রতি শুক্রবার আয়োজিত এ বাজারের ষষ্ঠ পর্বেও ছিল ব্যাপক মানুষের সমাগম। ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহের কারণে আয়োজনের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
উইজার্ড শোবিজ ও আইসিসিবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বাজারে একই স্থানে নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি কেনাবেচার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। গত পাঁচ সপ্তাহের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ সপ্তাহেও গাড়িপ্রেমীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
গতকাল দিনভর বৃষ্টি থাকলেও আইসিসিবির এক্সপো ভিলেজের ভেতরে ছিল ব্যস্ততা। কেউ পছন্দের গাড়ি দেখছিলেন, কেউ বিক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছিলেন। আবার কেউ গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংকঋণের সুবিধা সম্পর্কে জানতে ব্যস্ত ছিলেন। প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্রেতারা তাঁদের গাড়ি নিয়ে আসেন। ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতেও ছিল উল্লেখযোগ্য সাড়া।
সুপার সেল কার বাজারে শুধু গাড়ি নয়, মোটরসাইকেল কেনাবেচারও সুযোগ রয়েছে। ক্রেতারা যেমন পছন্দের বাহন বেছে নিতে পারছেন, তেমনি বিক্রেতারাও দালালের মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেদের ব্যবহৃত গাড়ি বা মোটরসাইকেল বিক্রি করতে পারছেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে বিভিন্ন শোরুম ঘুরে গাড়ি দেখতে ক্রেতাদের যে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, সুপার সেল কার বাজারে সেই ঝামেলা অনেকটাই কমে এসেছে। এখানে একই ছাদের নিচে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি দেখার সুযোগ মিলছে। ফলে প্রায় ৫০টি শোরুম ঘুরে গাড়ি দেখার অভিজ্ঞতা এক জায়গায় বসেই পাচ্ছেন ক্রেতারা।
আয়োজকরা আরও জানান, এক্সপো ভিলেজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বৃষ্টি কিংবা রোদের কারণে গাড়ি দেখা ও কেনাবেচায় কোনো বিঘ্ন ঘটছে না। ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দালালমুক্তভাবে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আইসিসিবির ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের “সুপার সেল কার বাজার”-এর ষষ্ঠ পর্ব চলছে, যা বিগত প্রায় দেড় মাস ধরে পরিচালিত হচ্ছে। সকাল থেকে দিনভর মুষলধারে বৃষ্টি হলেও আইসিসিবির এক্সপো ভিলেজে এক ছাদের নিচে চমৎকার পরিবেশ থাকায় বাইরের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কোনো নেতিবাচক প্রভাব কার বাজারে পড়েনি। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ক্রেতা, দর্শনার্থী ও বিক্রেতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, ঢাকায় সন্ধ্যার দিকে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ায় আয়োজনের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চলছে সুপার সেল কার বাজার।

সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ ও হামলা: প্রকৃত কারণ জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ দরকার

0

 

ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এখন আর কেবল একটি স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর একের পর এক বক্তব্য, বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসা এবং সর্বশেষ টকশোতে সরকারের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ কী, তাঁর অভিযোগের ভিত্তি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সালমান মুক্তাদির একজন পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সম্প্রতি তাঁর ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর থেকেই ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল, হামলার প্রকৃত কারণ কী এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব নিয়ে সমাজমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
বিশেষ করে সালমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। হামলার পর তিনি ফেসবুক লাইভে এসে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। সোমবার রাতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি আবারও বিষয়টি নিয়ে বিস্ফোরক বক্তব্য দেন এবং সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

টকশোতে সালমানের বক্তব্যের ধরনও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা ধরনের কাগজপত্র ও তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেন এবং সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজে পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন এবং তাঁর সব অর্থ বৈধ। বাংলাদেশে থাকবেন না বলেও তিনি জানান।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—সালমান কেন একই ঘটনা নিয়ে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন? প্রথমে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলার পর পরে কেন তিনি সেই অবস্থান পরিবর্তন করলেন? আবার সর্বশেষ টকশোতে কেন এতটা দৃঢ় অবস্থান নিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। সালমান নিজেও বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে সরকার চাইলে তাঁকে তলব করতে পারে।

তাঁর বক্তব্যের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য, নথি বা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ যাচাই না করে লাখো মানুষের সামনে একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত ও ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সালমান মুক্তাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকটি কারণ সামনে আসে।

প্রথমেই যাচাই করা দরকার, সালমান মুক্তাদিরের তোলা চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তি কী এবং এর পক্ষে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ আছে কি না।

হামলার পর ফেসবুক লাইভে সালমান দাবি করেছিলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ ছিল, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই তাঁর স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সালমানের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর কাছে কেউ সরাসরি চাঁদা দাবি করেনি এবং চাঁদা চাওয়া হলে তিনি তা দিয়ে দিতেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফলে একই ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য কেন সামনে এসেছে, সেটি পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চাওয়া হতে পারে—কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছিলেন, কার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিলেন এবং অভিযোগটির পক্ষে তাঁর কাছে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা।

এখন পর্যন্ত পুলিশ ও প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাটি মূলত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হয়নি। ঢাকার ইসিবি চত্বরের পাশে ওই জমি নিয়ে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমির মালিকানা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এই বিরোধের জেরেই আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ওই হামলার সময় প্রকল্প এলাকায় থাকা সালমানের টিনশেড স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই এখানে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। বিতর্কিত জমিতে স্টুডিও নির্মাণের আগে সালমান মুক্তাদির জমি ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধ সম্পর্কে জানতেন কি না এবং কোনো পক্ষ তাঁকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

তৃতীয়ত, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে বলেছিলেন, সালমান মুক্তাদির সমাজমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও থানায় কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা করেননি। এর বিপরীতে সালমান দাবি করেন, হামলার রাতেই তিনি ভোররাত পর্যন্ত থানায় অবস্থান করে মামলা করার আবেদন করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে মামলা নেয়নি। পরে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর মামলা গ্রহণ করা হয়।

এখানে ঘটনার রাতে থানায় আসলে কী ঘটেছিল, সালমান কখন থানায় গিয়েছিলেন, কী অভিযোগ করেছিলেন এবং এজাহারে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে থানার নথি, মামলা দায়েরের সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

চতুর্থত, সালমান মুক্তাদিরের সমাজমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি একজন প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এবং তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাঁকে সমাজমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সালমানের বক্তব্যের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক পরিবেশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি কোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে প্রচার করেছেন কি না, করে থাকলে তার কারণ কী—তাও তদন্তের বিষয় হতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, সালমান মুক্তাদির এ ঘটনায় একজন ভুক্তভোগী। তাঁর স্টুডিওতে হামলা হয়েছে, মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রী ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ রয়েছে। একজন ভুক্তভোগী হিসেবে তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক অভিযোগ এবং হামলার প্রকৃত নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনের স্বার্থে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তপ্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে। তিনি কোনো তৃতীয় পক্ষের হয়ে কাজ করেছেন কি না, কিংবা অন্য কোনো পক্ষ তাঁর বক্তব্য বা অবস্থানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

এদিকে সালমান মুক্তাদিরের অর্থের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্ট বিভাগ তাঁর ব্যাংক হিসাব, অ্যাকাউন্ট খোলার কাগজপত্র এবং লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।

সালমান অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর সব অর্থ বৈধ ও সাদা।
এ ছাড়া তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ব্যবসার কয়েকটি গুদাম শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে সিল করে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সালমান ও তাঁর শ্বশুর উভয়েই দাবি করেছেন, তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই।
সব মিলিয়ে সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এখন শুধু একটি হামলার তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর অভিযোগের ভিত্তি, বক্তব্যের পরিবর্তন, জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বিষয়—সবগুলো দিক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

তাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সেটিকে শুধু কোনো রাজনৈতিক অভিযোগের কারণে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে পুরো ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর কাছে থাকা নথি, তথ্য ও বক্তব্য তদন্তের অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এতে হামলার প্রকৃত কারণ যেমন স্পষ্ট হতে পারে, তেমনি তাঁর তোলা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

দুদকের ৩ উপপরিচালক ও ৯ সহকারী পরিচালক পদে রদবদল

0

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার ১২ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে। রদবদল হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে বরখাস্তের ১৫ বছর পর সম্প্রতি চাকরি ফিরে পাওয়া উপপরিচালক এম এম শাব্বির হাসানও রয়েছেন। গত সোমবার (৬ অক্টোবর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
দাপ্তরিক আদেশ অনুযায়ী, দীর্ঘ দেড় দশক পর পুনর্বহাল হওয়া উপপরিচালক এম এম শাব্বির হাসানকে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ থেকে বদলি করে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে উপপরিচালক (পরিদর্শন) পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বিভাগীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকা উপপরিচালক মো. আল-আমিনকে চট্টগ্রামের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এবং প্রধান কার্যালয়ের (গণসচেতনতা ও গণশুনানি-২) উপপরিচালক মো. আবু সাইদকে খুলনার বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১ শাখায় কর্মরত মো. আবুল কালাম আজাদকে ঠাকুরগাঁও সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এবং মানিলন্ডারিং-২ শাখার মো. এমরান হোসেনকে কুমিল্লার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ ও রেকর্ড শাখা থেকে আসাদুজ্জামানকে প্রধান কার্যালয়ের অনুসন্ধান ও তদন্ত-৩, সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলামকে গোয়েন্দা ইউনিটে এবং মো. শফিকুল ইসলামকে অনুসন্ধান ও তদন্ত-৪ শাখায় পদায়ন করা হয়।একই আদেশে সহকারী পরিচালক আমির হোসেনকে প্রধান কার্যালয়ের অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ শাখায়, মো. জাহিদুল ইসলামকে প্রধান কার্যালয় থেকে ঢাকা-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এবং মো. হোসেন আলীকে কুড়িগ্রামের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি অপর সহকারী পরিচালক মো. জাহিদুল ইসলামকে প্রধান কার্যালয়ের দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে পদায়ন করা হয়েছে।

আদেশে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনিক স্বার্থে বদলিকৃত এই কর্মকর্তাদের ৮ অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান সম্পন্ন করতে হবে।

নতুন রাডার ও এটিসি টাওয়ার চালুর পর বদলে গেল এভিয়েশন খাতের চিত্র

0

 

ঢাকায় বসানো হয়েছে নতুন রাডার। এখন থেকে বাংলাদেশের আকাশ সীমায় এলেই দিতে হবে রাজস্ব। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের কারণে এতদিন এই ব্যবস্থা চালু ছিলনা। এসব সমস্যা কাটিয়ে দেশের আকাশসীমা এখন পুরোপুরি নিজেদের কব্জায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার এবং পূর্ণাঙ্গ রাডার ব্যবস্থা চালুর পর পাল্টে গেছে দেশের এভিয়েশন খাতের চিত্র।
<span;>পুরোনো জীর্ণদশা কাটিয়ে আকাশপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে গত ছয় মাসেই ফ্লাইওভার বা ওভারফ্লাই চার্জ বাবদ সরকারের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পর্যাপ্ত আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর রাডার ব্যবস্থার অভাব ছিল। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আকাশসীমার একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থাকায় দেশের ওপর দিয়ে বিদেশি বিমান চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ফি বা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো না। এমনকি নামমাত্র বা দুর্বল কাঠামোর কারণে আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় এক ধরণের পরোক্ষ দুর্বলতা ও পরনির্ভরশীলতা বজায় ছিল।
অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) এবং কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স (সিএনএস) সিস্টেমের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই মূলত দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আধুনিক এটিসি টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়।
রাজস্ব আয়ের চিত্র:
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) এবং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রযুক্তি চালুর পর থেকেই ওভারফ্লাই রাজস্ব আয়ের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু ওভারফ্লাই ফি বাবদই আয় হয়েছে রেকর্ড ৮০৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৩৩৮ কোটি টাকার ওপরে আয় হলেও, টাওয়ারটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর কেবল জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসের ব্যবধানেই আয় ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসেই নিয়মিতভাবে গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা হচ্ছে সরকারের খাতে।
যেভাবে দূর হলো দুর্বলতা: এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত পাঁচ দশকে দেশে যে অ্যানালগ ও সীমিত সক্ষমতার রাডার ব্যবহৃত হতো, তাতে বিদেশি বিমানগুলোর সঠিক রুট মনিটরিং করা দুরূহ ছিল। অনেক উড়োজাহাজ রাডার ফাঁকি দিয়ে বা কম নজরদারির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করত। যার আর্থিক ক্ষতি পোহাতে হতো দেশকে।
বর্তমানে ফ্রান্সের বিখ্যাত এভিয়েশন ও ডিফেন্স টেকনোলজি কোম্পানি ‘থেলস’-এর সঙ্গে জি-টু-জি (গভর্নমেন্ট টু গভমেন্ট) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত প্রায় ৯৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি দেশের আকাশ নিরাপত্তায় বিপ্লব এনেছে। সিএএবির নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার ফলে এখন দেশের আকাশসীমার এক ইঞ্চি জায়গাও আর নজরদারির বাইরে থাকছে না। বিদেশি যেকোনো বিমান দেশের ওপর দিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাকিং সিস্টেমে ধরা পড়ছে এবং নির্ধারিত ফি আদায় নিশ্চিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন রুটে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এ খাত থেকে অর্জিত এই রাজস্ব দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন ও স্থায়ী শক্তিশালী উৎস হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

নানা আয়োজনে বসুন্ধরা সিটির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

0

২২ বছরের পথচলা পূর্ণ করেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শপিং ও লাইফস্টাইল গন্তব্য বসুন্ধরা সিটি শপিং মল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনভর নানা আয়োজন, ফ্যাশন শো, তারকাদের অংশগ্রহণে ফ্ল্যাশমব এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর ছিল শপিং মলের লেভেল-১ অ্যাট্রিয়াম। দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন পায় উৎসবের আমেজ।
সোমবার দুপুর ২টায় বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ উপলক্ষে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচি। এর মধ্যে ছিল আকর্ষণীয় ফ্যাশন শো, সেলিব্রিটি ফ্ল্যাশমব এবং শিল্পীদের মনোজ্ঞ পরিবেশনা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বসুন্ধরা সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্যাপ্টেন শেখ এহসান রেজা (অব.)। এ সময় তিনি বসুন্ধরা সিটির ২২ বছরের পথচলায় ক্রেতা, ব্র্যান্ড পার্টনার, ব্যবসায়িক সহযোগী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, শুরু থেকেই বসুন্ধরা সিটিকে এমন একটি আধুনিক শপিং ও লাইফস্টাইল গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ছিল, যেখানে কেনাকাটার পাশাপাশি পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে মানুষ আনন্দঘন সময় কাটাতে পারবেন।
ক্যাপ্টেন শেখ এহসান রেজা আরও জানান, গত ২২ বছরে ক্রেতাদের আস্থা, ভালোবাসা ও সহযোগিতায় বসুন্ধরা সিটি একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক সেবা, নতুন ব্র্যান্ড, উন্নত সুযোগ-সুবিধা এবং আকর্ষণীয় আয়োজনের মাধ্যমে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সেলিব্রিটি ফ্ল্যাশমব ও ফ্যাশন ফেস্ট। জনপ্রিয় তারকা বিদ্যা সিনহা মিম, সাবিলা নূর, তমা মির্জা ও জিয়াউল রোশানের অংশগ্রহণে বিশেষ ফ্ল্যাশমব দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি করে। পাশাপাশি আলিফা ডান্স টিমের প্রাণবন্ত পরিবেশনাও দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণে মোট ১০টি ফ্যাশন শোর আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনে ক্লাবহাউস, ফ্রিল্যান্ড, ক্যাপশন, ইনফিনিটি, দুবাই বোরকা, শিশু পরিবহন, স্টানিং বাই শাহাদ, জোইস, আর্টফিট, ইরানি বোরকা ও সি স্কাইসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড অংশ নেয়।
দীর্ঘ ২২ বছরের যাত্রায় ক্রেতা, ব্র্যান্ড পার্টনার, ব্যবসায়িক সহযোগী, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সর্বস্তরের দর্শনার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বসুন্ধরা সিটি কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন ও বিশেষ আয়োজনের টাইটেল স্পন্সর ছিল রেইজ বাংলাদেশ। আর পাওয়ার্ড বাই পার্টনার হিসেবে ছিল ইকিউব। তাদের সহযোগিতায় পুরো আয়োজন আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

মেজর(অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন হয়নি,পাঠানো হলো কারাগারে

0

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘বিশৃঙ্খলা, সরকারি কাজে বাধা, নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি’ দেওয়ার মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
এক দিনের রিমান্ড শেষে রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয় বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন শনিবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
<span;>রিমান্ড শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম।
আবেদনে বলা হয়, এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার ঘটনা সম্পর্কে আসামিকে ‘ব্যাপক ও নিবিড়ভাবে’ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মামলার ঘটনার ‘সত্যতা স্বীকার’ করেছেন এবং কিছু ‘তথ্য’ দিয়েছেন। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে জানিয়ে আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আখতারুজ্জামানের পক্ষে আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন।
শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। শুনানির সময় আখতারুজ্জামানকে এজলাসে তোলা হয়।
যে ঘটনায় মামলা
গত বৃহস্পতিবার মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব এবং লাগেজ পেতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, “ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?”
মামলার এজাহারে বলা হয়, ১ অক্টোবর সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে ওই সময় আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
অভিযোগে বলা হয়, কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং ‘অশোভন’ আচরণ করেন।
এর মধ্যে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান।
রাগীব সামাদ সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং গালিগালাজ করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।
এজাহারে বলা হয়, নির্বাহী পরিচালক অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে বলেন, “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা”, “গেইট আউট ফ্রম হিয়ার”, “ঘাড় ধরে বের করে দিব”, “কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন”, “মাইর খাইতে চান?”
আখতারুজ্জামানের আচরণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন বলে এজাহারে লেখা হয়েছে।
এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেন বলেও মামলার বিবরণে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।”সূত্র – বিডি নিউজ।

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ কমাতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা

0

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসা পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের যে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, তা কমাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজের আওতায় স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ কমাতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজশাহী নগরের ভেড়িপাড়া মোড় এলাকার প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেসরকারি খাতে গতি সঞ্চার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ব্যবসায়ী, চেম্বার নেতারা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার।
অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তরুণদের মধ্যে যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাতে ‘উদ্যোগ’ নামে একটি বিশেষ স্কিম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে উদ্যোক্তা নির্বাচন করে মোট ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে স্কিমটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী নভেম্বর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হবে।
কৃষকদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের সুবিধা যাতে আরও বেশি প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায়, সে জন্য প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি জামানত রাখার পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের অর্থায়নপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে কার্যকর করা জরুরি। এ লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।