অবৈধভাবে চাল মজুত করার মামলায় স্কয়ারের এমডি অঞ্জন চৌধুরীকে ৬ সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। ৬ সপ্তাহ পর তাকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। সোমবার (৬ জুন) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি সাহেদ নুরউদ্দিনে সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর সদরে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের গুদামে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার ১২৪ টন আতপ চাল জব্দের ঘটনায় এ মামলা দায়ের হয়েছিল। মামলায় স্কয়ার গ্রুপের এমডির পক্ষে আদালতে জামিন আবেদনের শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।
গত ১ জুন দিনাজপুর সদরে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের গুদামে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার ১২৪ টন আতপ চাল জব্দ করে প্রশাসন। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে মিলের ইনচার্জকে।
দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মর্তুজা আল মঈদ বলেন, উপজেলার ১ নম্বর চেহেলগাজী ইউনিয়নের গোপালগঞ্জ বাজারে কোম্পানিটির ছয়টি গুদামে গত ৩১ মে বিকেল থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়।
এ সময় মিলের ছয়টি গুদামে ৫ হাজার ১২৪ টন আতপ চাল পাওয়া যায়। তবে মিলের অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৩১২ টন। সে হিসেবে মিলে বেশি মজুত ছিল চার হাজার টনের বেশি চাল।
‘এ সময় কাগজপত্র ও মিলে চাল মজুতের হিসাব চাওয়া হলে মিলের ইনচার্জ জায়েদ হোসেন সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে মিলের কর্মকর্তারা বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে আসেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে মিলের ছয়টি গুদামে রাখা চাল উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের জিম্মায় দেয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে দিনাজপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায় বাদী হয়ে মিলের স্বত্বাধিকারী অঞ্জন চৌধুরী ও মিলের ইনচার্জ জায়েদের নামে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। মিলের ইনচার্জকে পুলিশ গ্রেফতার করে। জব্দ চালের বাজার মূল্য প্রায় ৪১ কোটি টাকা।’
অবৈধভাবে চাল মজুত : স্কয়ারের এমডি অঞ্জন চৌধুরীকে ৬ সপ্তাহের জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট
সর্বোচ্চ আদালতেই কার্যকর হয়নি আইন, ৬০ দিনের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টে তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিলো হাইকোর্ট
তথ্য অধিকার আইন অনুসারে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এ ছাড়া তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর ৪ ও ১০ ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টে ‘তথ্য সেল’ প্রতিষ্ঠা করে একজন তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
এর আগে গত ২৬শে মে সুপ্রিম কোর্টে তথ্য প্রদান ইউনিট চালু এবং কর্মকর্তা নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার এবং হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারকে বিবাদী করা হয়। রিট আবেদনে বলা হয়, তথ্য অধিকার আইন- ২০০৯ অনুযায়ী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে তথ্য সেল প্রতিষ্ঠা ও তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এখানে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সেল বা তথ্য কর্মকর্তা নেই। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অবাধ তথ্য প্রবাহে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার দেয়া হয়েছে। তথ্য সেল না থাকায় এই অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে আইনজীবী শিশির মনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করেছিলেন। এরপর ছয় মাস পার হলেও কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি সুপ্রিম কোর্ট। পরে তথ্য অধিকার আইনের বিধান বাস্তবায়নের জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে গত ১৬ই মে এ বিষয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে বিধান করার লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ২০ নম্বর আইন) প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা নাগরিকগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
এতে আরও বলা হয়, আইনের ধারা ২(খ)(অ) এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের আওতাধীন একটি কর্তৃপক্ষ। ওই আইনের ধারা ১০ অনুযায়ী তথ্য সরবরাহের নিমিত্তে প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদান ইউনিটের জন্য একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। উক্ত আইনের বিধান প্রতিপালনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়নের এক যুগেরও অধিক সময় অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে এমন কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়নি।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় খালেদা জিয়াকে দাওয়াত দিতে আইনি বাধা নেই : আইনমন্ত্রী
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় খালেদা জিয়াকে দাওয়াত দিতে আইনি কোন বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। আইনমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যাপারে দুটি শর্ত আছে, তা হলো তিনি বাংলাদেশের ভিতরে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন আর বিদেশে যেতে পারবেন না। সে কারণে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় তাকে দাওয়াত দিতে আইনি কোন বাধা নেই। রোববার ঢাকায় বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য আয়োজিত ১৪৬তম রিফ্রেসার কোর্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় দাওয়াত দিবে। এ বিষয়ে আইনি কোন বাধা নেই বলে তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। আনিসুল হক বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিদ্বেষের বশীভূত হয়ে কারও প্রতি কোন ‘অ্যকশন’ নেন না। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদ্বয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেয়া হয়েছিল। সেগুলো দুদকের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। তারা যদি এটা বলে যে, আওয়ামী লীগ সরকার এই মামলাগুলো করেছে, তাহলে আমার মনে হয় যে, তারা শুধুশুধু জনগণ যেটা বিশ্বাস করে তাদের দুর্নীতির ব্যাপারে, সেটাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য আওয়ীমী লীগ সরকারকে দোষারোপ করছে। তাদের দোষারোপ করাটা ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। ২০০৪ সালের আইনের পরে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুদককে চেয়ার টেবিলও দেয়নি বিএনপি সরকার। ২০০৭ সালে এটাকে প্রকৃত কার্যকর করা হয়েছে। বিচার বিভাগের বাজেট বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তিসংগত যে কোন প্রয়োজনে অর্থ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় কার্পণ্য করবে না। জাতীয় বাজেটে আইন মন্ত্রণালয়কে যে টাকা দেয়া হয় তা আগে কোন সরকার দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারই প্রথম বিচারকদের প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে ই-জুডিসিয়ারি প্রকল্পের একটি অংশ বাস্তবায়নের জন্য ২১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এটা আইন মন্ত্রণালয়ের নামে বরাদ্দকৃত মূল বাজেটের বাইরে। এর আগে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি আবারও বলেন, বাক স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বন্ধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়নি। সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ করার জন্য এই আইন করা হয়েছে। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, কোর্স পরিচালক মীর মো. এমতাজুল হক বক্তৃতা করেন।
২২ বছর পর মিয়ানমারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে সামরিক জান্তা; ফাঁসী দেয়া হচ্ছে সূচির দুই সহযোগিকে
মিয়ানমারের জান্তা সরকার সন্ত্রাসবাদের দায়ে দোষী সাব্যস্ত অং সান সু চির দলের একজন সাবেক সদস্য এবং একজন বিশিষ্ট গণতন্ত্রকামী সক্রিয় কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে। একজন মুখপাত্র এএফপি সংবাদ মাধ্যমকে এ কথা জানিয়েছে। ১৯৯০ সালের পর এটাই হবে দেশটিতে প্রথম বিচার বিভাগীয় মৃত্যুদণ্ড।
সাবেক এমপি ফিয়ো জেয়া থাও এবং গণতন্ত্রকামী সক্রিয়কর্মী কো জিমিসহ চারজনকে “কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী ফাঁসি দেওয়া হবে।” জাও মিন তুন এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত বছর ক্ষমতা দখলের পর ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে জান্তা সরকার অভ্যুত্থান বিরোধী কয়েক ডজন কর্মীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে কিন্তু মিয়ানমার কয়েক দশক ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি।
অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির সাবেক সদস্য ফিয়ো জেয়া থাওকে নভেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের অধীনে অপরাধের জন্য তাকে জানুয়ারি মাসে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
বিশিষ্ট গণতন্ত্রকামী সক্রিয়কর্মী কিয়াও মিন ইউ যিনি “জিমি” নামে বেশি পরিচিত – সামরিক ট্রাইবুনালতাকেও একই শাস্তি দিয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, “দু’জন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য জান্তা সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রগতিশীল সামরিক-বিরোধী প্রতিরোধের আগুনে গ্যাস ঢালার মতো কাজ হবে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ হত্যা রহস্য উদঘাটন করলো পিবিআই, মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার, চারজন গ্রেফতার
মুন্সিগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউল হত্যার ৫ মাসের মধ্যেই এর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটন করে তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিলো পিবিআই। মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়েছে ব্যবসায়ী অনুপ বাউলের মৃতদেহ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ধানমন্ডির পিবিআই সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানান সংস্থাটির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার।

তিনি জানান রিপন মণ্ডল নামের একজনকে ১০ লাখ টাকা ধার দেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউল। রিপন মণ্ডলের মাধ্যমে দেওয়া সেই টাকা নিয়ে সৃষ্টি হয় বিরোধ। বিষয়টি নিয়ে অনুপ বাউলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নয়ন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রিপনসহ চারজন অনুপ বাউলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর অনুপ বাউলের মরদেহ মাটি কাটার ভেকু দিয়ে ৪ ফুট গভীর করে বালির নিচে পুঁতে রাখেন রিপন।
রিপন ভেবেছিলেন, মাটির নিচে সব কিছুই চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ঘটনার পাঁচ মাস পর নিখোঁজ স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউলের লাশ ১৬ ফুট বালির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়ন মণ্ডলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন ভেকুর মালিক রিপন মণ্ডল (২৬), পিযুষ করাতি (২৫) ও দিলীপ চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, পাঁচ মাস আগে গত ৪ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদী খাঁন এলাকা থেকে শ্বশুরবাড়ি মাদারীপুর যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউল। এ ঘটনায় পরের দিন নিখোঁজের ছোট ভাই বিপ্লব বাউল একটি জিডি করেন। বিষয়টি চাঞ্চল্যকর হওয়ায় সিরাজদী খাঁন থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, ডিবি ও পিবিআই মুন্সিগঞ্জ জেলা তদন্ত শুরু করে।
পিবিআই মুন্সিগঞ্জ জেলা জিডি তদন্ত করতে গিয়ে ভুক্তভোগীর ছোট ভাই বিপ্লব বাউলকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিপ্লব বাউল বাদী হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জ মডেল থানা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা করেন। থানা পুলিশ মামলাটি প্রায় তিন মাস তদন্ত হওয়ার পর রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় গত ২১ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পায় পিবিআই ঢাকা জেলা।
বনজ কুমার মজুমদার আরও বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. সালে ইমরান প্রথমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত রিপন ও ড্রামে করে মরদেহ বহনকারী অটোরিকশাচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য, গোয়েন্দা তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে রিপনকে চিহ্নিত করা হয়। তারপর অনেকটা নিশ্চিত হয়ে আসামি রিপন, পিযুষ, নয়ন ও দিলীপকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যে মরদেহ গুমের স্থান চিহ্নিত করা হয়। গতকাল বুধবার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) বোয়ালখালী সিরাজদী খাঁন এলাকায় রিপন তার নিজস্ব ভেকু চালিয়ে ১৬ ফুট গভীর বালির নিচ থেকে অনুপ বাউলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেন।
পিবিআইপ্রধান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানান, নিহত অনুপ বাউলের স্বর্ণ ব্যবসার সহযোগী নয়ন মণ্ডল। তাদের দুজনের মধ্যে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ ছিল। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়ন মণ্ডল স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউলকে খুনের পরিকল্পনা করেন। নয়ন তার চাচাতো ভাই রিপন, পিযুষ ও দিলীপের সাহায্য নিয়ে অনুপ বাউলকে হত্যা করেন।
তিনি আরও বলেন, গত ৪ জানুয়ারি সকালে পাওনা টাকা দেওয়া ও মাদারীপুরে স্বর্ণের অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অনুপ বাউলকে জয়েনপুরে ডেকে নিয়ে আসেন নয়ন মণ্ডল। জয়েনপুরে রিপন মণ্ডলের গ্যারেজে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা রিপন মণ্ডল, পিযুষ ও দিলীপের সঙ্গে নয়ন ও অনুপ বাউল একত্রিত হন। ওই সময় পাওনা টাকা নিয়ে ভুক্তভোগী অনুপ বাউলের সঙ্গে তাদের ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে চারজন মিলে অনুপ বাউলকে গ্যারেজের খাটের মধ্যে ফেলে কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর লাশ একটি ড্রামে ভরে রাখেন। পরে বিকেল ৩টায় আসামিরা অটোরিকশা করে লাশ ভর্তি ড্রামটি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদী খান থানার বোয়ালখালী বিসিক এলাকায় বালুর মাঠের কাছে নিয়ে যান। অটোরিকশাচালক চলে গেলে আসামিরা ড্রামটিকে বালুর মাঠের ভেতরে নিয়ে যান। তারপর কাদাযুক্ত একটি স্থানে লাশ পুঁতে ফেলে আসামিরা চলে যান।
লাশ পুঁতে রাখার পর নয়ন তার প্রতিবেশী পিংকুর বাসায় গিয়ে গোসল করেন। যেহেতু নিহত নয়নকে নিয়ে অনুপের মাদারীপুর যাওয়ার কথা ছিল। তাই নিহতের লোকজন নয়নকে অনুপের বিষয়ে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সাক্ষাতের বিষয়টি অস্বীকার করে নিখোঁজ অনুপকে খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেন নয়ন। বিভিন্ন সংস্থা নয়নকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যার বিষয়টি অস্বীকার করেন বলেও জানান পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।
হাজিরা থেকে অব্যাহতি; পরীমণির অনুপস্থিতেই বিচার চলবে
মাদক মামলায় ঢাকাই সিনেমার আলোচিত নায়িকা শামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমণিকে সশরীরে হাজির হতে হবে না বলে জানিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার দশ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক নজরুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এদিন পরীমণি আদালতে হাজির হন। তার উপস্থিতিতে মামলার বাদী র্যাব-১ এর কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমানকে আইনজীবীরা জেরা করা শেষ করেন।
গত ১২ মে আদালতে পরীমণির সশরীরে হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয় আইনজীবীর মাধ্যমে। পরীমণির মা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আবেদন করা হয়েছিল।
সে অনুযায়ী তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নেন আদালত। আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা প্রদানের আবেদন মঞ্জুর করেন। শুনানিকালে মামলার অপর দুই আসামি পরীমনির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দিপু ও পরীমনির খালু মো. কবীর হাওলাদার আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামী ১৯ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি পরীমনিসহ তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
নওগাঁর জামাত নেতা মন্টুসহ তিন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নওগাঁ জামাতে ইসলামীর নেতা রেজাউল করিম মন্টুসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মুক্তিযুদ্ধের সময় নওগাঁয় সাতজনকে হত্যার পাশাপাশি আরও অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন, অপহরণ, লুণ্ঠণ ও অগ্নিসংযোগের মত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের এই দণ্ড দেয়া হয়।
দণ্ডিত আসামিরা হলেন- নওগাঁর মো. রেজাউল করিম মন্টু, মো. নজরুল ইসলাম ও মো. শহিদ মন্ডল। তাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম পলাতক, বাকি দুজন রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার (৩১ মে) এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার এবং বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম।
১৪৪ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধের যে তিন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছিল, তার সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রেজাউল করিম মন্টু ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত জামাতে ইসলামী জয়পুরহাট জেলার আমির ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মন্টু তখন থেকেই ছিলেন জামাতের রাজনীতিতে সক্রিয়। বাকি দুই আসামি জামাতের সমর্থক।
রায়ের সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর হায়দার আলী, সুলতান মাহমুদ সীমন ও আবুল কালাম। আসামিদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম ও আব্দুস সাত্তার পালোয়ান। তামিম পলাতক আসামি নজরুলের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে রাজাকারের যে তালিকা দিয়েছে তা হল শিবিরের তালিকা। অথচ ওই সময় শিবির ছিল না। আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ। আসামিদের সঙ্গে আলোচনা করব। আশা করি আপিল করলে আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাবেন।
মামলার বিবরণ :
২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর এ মামলার তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। পরের বছর ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর রেজাউল করিম মন্টুকে ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে জয়পুরহাট দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। শহিদ মন্ডল ও ইসহাক আলীকে গ্রেফতার করা হয় একই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। অভিযোগ গঠনের আগে কারাগারে ইসহাক আলী মারা গেলে তাকে এ মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়।
তদন্ত শেষ করে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনে প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। পরের বছর ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আসামিদের বিচার শুরু করেন আদালত। একই বছরের ২৫ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, শেষ হয় ২০২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি।
প্রসিকিউশনের ৩১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। সেই যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৬ মে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।
আসামি রেজাউল করিম মন্টু সর্বশেষ জয়পুরহাট সদরে থাকতেন। জেলা শহরের প্রফেসর পাড়ায় যে বাসায় তিনি থাকতেন সেটি পরিচিতি পেয়েছে রাজাকার বিল্ডিং নামে। আর পলাতক নজরুল ইসলাম ঢাকায় তেজগাঁওয়ে থাকতেন। শহীদ মন্ডলের বাড়ি নওগাঁর বদলগাছী থানার চাঁপাডাল গ্রামে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৭ অক্টোবর বিকাল আনুমানিক ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সময়ে আসামিরা নওগাঁর বদলগাছী থানার পাহাড়পুর ইউনিয়নের রানাহার গ্রামে হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের নিরীহ-নিরস্ত্র সাহেব আলী, আকাম উদ্দিন, আজিম উদ্দিন মন্ডল, মোজাফফর হোসেনকে হত্যাসহ ওই সময় ১০-১২টি বাড়ি লুট করে অগ্নিসংযোগ করে।
১৯৭১ সালের ৮ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক দেড়টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে আসামিরা নওগাঁর বদলগাছী থানার পাহাড়পুর ইউনিয়নের খোজাগাড়ী গ্রামে হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের নিরীহ-নিরস্ত্র মো. নুরুল ইসলামকে হত্যা করে। এসময় তারা ১৫-২০টি বাড়ি লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ করে।
একই সময়ে ১৯৭১ সালের ৮ অক্টোবর বিকাল আনুমানিক ৫টা থেকে পরদিন ৯ অক্টোবর আনুমানিক বিকাল ৫টা পর্যন্ত নওগাঁর বদলগাছী থানার পাহাড়পুর ইউনিয়নের মালঞ্চা গ্রামে হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের মো. কেনার উদ্দিন এবং মো. আক্কাস আলীকে আটক করে নির্যাতন করে। পরে অপহরণ করে জয়পুরহাটের কুঠিবাড়ি ব্রিজে নিয়ে হত্যা করে। ওই সময়ের মধ্যে আসামিরা ৪০ থেকে ৫০টি বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে।
দরকার হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা হবে: আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা হয়- এমন কোনও আইন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার করবে না। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে জায়গা পায়নি, যেটি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশ করে গেছেন। মঙ্গলবার (৩১ মে) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মী আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ডাটা সুরক্ষা আইন নিয়ে আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এ কথা বলেন। বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ এর সভাপতি তপন বিশ্বাস। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসউদুল হক। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এই আইন না থাকলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভুল ব্যবহারের অভয়ারণ্য হবে দেশ। তবে এই আইনের যে কয়েকটি জায়গায় অসামঞ্জস্য আছে বলে মনে করা হয়, সেটার বিষয়ে সরকার সচেতন। তিনি বলেন, এ আইনে অনেকে অহেতুক মামলা করছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালে আমি বলেছিলাম, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করার পর তিনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। এ আইনে মামলা হলে সঙ্গে-সঙ্গে কাউকে যেন গ্রেফতার না করা হয়, আমরা সেই ব্যবস্থা নিয়েছি। এর ফলে এখন যত্রতত্র গ্রেফতার হচ্ছে না। দরকার হলে এ আইনটিও সংশোধন করা হবে। গণমাধ্যমকর্মী আইনটি সাংবাদিকদের সুবিধার জন্যই করা হয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সুস্থ সাংবাদিকতা বন্ধ করার জন্য বর্তমান সরকার কোনও আইন করেনি, করবেও না।’ বলেন, ‘সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সমাজকে ভাগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা বন্ধ করার জন্যই আইন করা হচ্ছে।’ ইউনূস (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) সাহেবের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা মামলা করেছিলেন। সেই মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। যে ৪৩৭ কোটি টাকা নিয়ে বিরোধ ছিল সেটা ইউনূস সাহেব পরিশোধে রাজি হয়েছেন, সেই প্রেক্ষিতেই মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে কী গেছে- কার কত ক্ষমতা?’ ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্টের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আমার সঙ্গে দেখা করে তাদের সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বলেছে। আমি অবহিত হয়েছি। আমি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। ১ জুন আমি তার সঙ্গে বসবো। তিনি বলেন, কথা উঠেছে এই (ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট) আইনটির বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়নি। আমি নিশ্চিত করবো স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যেন আলোচনা করা হয়। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, সারা পৃথিবীতে ডাটা প্রটেকশন আইন নিয়ে কী কী আছে এটা পর্যালোচনা করার জন্য আমি সব আইন আনাচ্ছি। যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি।
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি জিয়াউর রহমান। আর জিয়া ছিলেন জাতির পিতা হত্যা ষড়যন্ত্রে খুনিদের মদদদাতা, আশ্রয়দাতা ও ইন্ধনদাতা। জিয়া-মনজুর হত্যায় সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি হচ্ছেন এরশাদ। আর এরশাদই যে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, এর অসংখ্য দালিলিক প্রমাণ রয়েছে।
৩০ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর রাতে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া নিহত হন। গত চার দশকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান হত্যার কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত বা বিচার হয়নি। জিয়া হত্যার তিন মাসের মধ্যে সামরিক আদালতে তড়িঘড়ি করে গোপন বিচারের মাধ্যমে ১৩ সামরিক কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। ফাঁসিতে মৃত ১৩ জনের ১২ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।
তাড়াহুড়া করা তদন্তে ৩৩ অফিসার ও ২ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারকে কোর্ট মার্শাল করার সুপারিশ করা হয়। সব আইনকানুন ও নিয়মনীতি ভঙ্গ করে চট্টগ্রামের বেসামরিক জেলখানায় ওই বিচারকাজ চলে। অভিযুক্তদের কঠিন ও ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। ওই বিচার ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও উদ্দেশ্যমূলক।
প্রহসনের ওই কোর্ট মার্শালে ১৩ অফিসারের ফাঁসি এবং ১৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। দুজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারকে ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। যাতে করে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক, এনসিও ও জেসিওদের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। উল্লেখ্য, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসাররা সৈনিক থেকে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন।
জিয়াকে যখন হত্যা করা হয় তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি ছিলেন মেজর আবুল মন্জুর।
গত চার দশকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যা কোনো পরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থান বা বিদ্রোহ ছিল না। এটা ছিল কিছু তরুণ সেনা অফিসারের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং তা ক্ষমতা দখলের জন্য ছিল না।
জিয়া হত্যার সময় মইনুল হোসেন ছিলেন অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল। জেনারেল মইনুল ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। জিয়া হত্যায় অভিযুক্ত অন্যতম পলাতক আসামি মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর ওই সময় থাইল্যান্ডে মইনুল হোসেনের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়া হত্যা নিয়ে তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে : ‘লে. কর্নেল মতিউর রহমান (মতি), লে. কর্নেল মাহবুব ও মেজর খালেদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ২৪ ডিভিশনের জুনিয়র অফিসাররা জিওসি জেনারেল মনজুরের অজান্তে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সার্কিট হাউস থেকে অপহরণ করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াকে চাপ দিয়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়, বিশেষ করে সেনাপ্রধান এরশাদসহ অন্যান্য দুর্নীতিপরায়ণ সামরিক অফিসার এবং পাকিস্তানপন্থি প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ ও অন্য দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করানো।
‘এরশাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হয়রানি- বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ঢালাওভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলিসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ব্যাপক দুর্নীতি নিয়ে জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছিল। ওই উচ্ছৃঙ্খল বিদ্রোহের মাধ্যমে জুনিয়র অফিসারদের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।’
জিয়া হত্যার বিষয়টি যে লে. কর্নেল মতি ও তার মদতদাতা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ ভালোভাবেই জানতেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
এটা শতভাগ নিশ্চিত যে, জিয়া হত্যার বিষয়টি জেনারেল মনজুর কোনোভাবেই জানতেন না। সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, ঘুম থেকে উঠিয়ে জেনারেল মনজুরকে জিয়া হত্যার খবর জানানো হয়। ভোরে মনজুর ও তার স্ত্রী যখন শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তখন তারা স্লিপিং ড্রেস পরা ছিলেন। মনজুর যে জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি জানতেন না, এর হাজারটা প্রমাণ দেয়া যাবে। কিন্তু হত্যার সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও তার অধীন অফিসাররা যেহেতু ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেছে, জিওসি হিসেবে জেনারেল মনজুর নিজেই এর দায়ভার গ্রহণ করেন।
দলের দুই উপদলের কোন্দল মেটাতে জিয়া ২৯ মে ১৯৮১ চট্টগ্রাম গিয়ে সার্কিট হাউসে ওঠেন। সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রী আমেনা বেগমসহ দলের আরও কয়েকজন। সার্কিট হাউসে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা হবে। জিয়া রাতটা চট্টগ্রামে কাটিয়ে পরদিন সকালে ঢাকা চলে যাবেন। দুপুরে খাবারের পর দলের মিটিং শুরু হয়। ৮টায় রাতের খাবার খেয়ে আবার মিটিং শুরু করেন। বিদ্রোহের সেই রাতে বেশ ঝড় হচ্ছিল। জিয়া সার্কিট হাউসের দোতলায় ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর ৪টার দিকে অফিসাররা অতর্কিতে সার্কিট হাউস আক্রমণ করে।
ওই আক্রমণের উল্লেখ্য বিষয় হলো, এতে কোনো সৈনিক, জেসিও বা এনসিওকে সরাসরি জড়ানো হয়নি। জুনিয়র অফিসাররা সরাসরি নিজেরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে রকেট লান্সার নিক্ষেপ করে। গুলির শব্দ শুনে জিয়া রুম থেকে বের হয়ে এলে কয়েকজন অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই ওই সময় লে. কর্নেল মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসে এবং পলকেই গজখানেক সামনে থেকে তার চায়নিজ স্টেনগানের এক ম্যাগাজিন (২৮টি) গুলি জিয়ার ওপর চালিয়ে দেয়। জিয়ার পুরো শরীর ঝাঁজরা হয়ে যায়। উপস্থিত অন্য অফিসাররা ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যান। তারা কেউ কোনো গুলি ছোড়েননি। দু-একজন অফিসার ‘কী করছেন, কী করছেন’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। প্রত্যক্ষদর্শী মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর এভাবেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীকে অবহিত করেন।
জিয়াকে হত্যার পেছনে লে. কর্নেল মতির ক্রোধ ও আক্রোশের কারণ ছিল। ১৯৮১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে, অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের কদিন আগে আমেরিকায় সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনয়নের জন্য তৎকালীন লে. কর্নেল মতিউর রহমান, লে. কর্নেল ইমামুজ্জামান (পরে মেজর জেনারেল) ও পাকিস্তান প্রত্যাগত লে. কর্নেল (পরে ব্রিগেডিয়ার) সাখাওয়াত হোসেনসহ ৫ জনকে একত্রে সেনাসদরে বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়।
ইমামুজ্জামান ও মতিকে বাদ দিয়ে সেনাপ্রধান এরশাদ আমেরিকায় প্রশিক্ষণের জন্য সাখাওয়াতকে মনোনীত করেন। সাখাওয়াতের চেয়ে মতি ও ইমামুজ্জামান অধিকতর যোগ্য ছিল বলে অনেকের ধারণা। মনোনয়ন-বঞ্চিত মতিউর রহমান এতে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন এবং ওই দিনই বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়ার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদেকের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভের কথা জানান।
মতি আরও অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারগণ আর্মিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং এই বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানানোর জন্য জেনারেল সাদেককে অনুরোধ করেন। বিদ্রোহী অফিসারদের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে সেনানিবাসে নিয়ে চাপের মুখে দুর্নীতিবাজ এরশাদকে বরখাস্তসহ মুক্তিযোদ্ধাদের দাবিদাওয়া আদায় করা। হঠাৎ করেই কার প্ররোচণায় মতি হত্যা করল জিয়াকে? পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে জিয়া হত্যায় মতির মূল ইন্ধনদাতা ও মদতদাতা সেনাপ্রধান এরশাদ।
বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি জিয়াউর রহমান। আর জিয়া ছিলেন জাতির পিতা হত্যা ষড়যন্ত্রে খুনিদের মদতদাতা, আশ্রয়দাতা ও ইন্ধনদাতা। জিয়া-মনজুর হত্যায় সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি হচ্ছেন এরশাদ। আর এরশাদই যে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, এর অসংখ্য দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। কর্নেল হামিদ তার গ্রন্থে ১৫১ পৃষ্ঠায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। হামিদ লিখেছেন- ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যায়, জিয়া হত্যার চার দিন আগে চট্টগ্রামে হিলটপ মেসে সেনাপ্রধান এরশাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিবেশে প্রায় দুই ঘণ্টা কোনো বিষয়ে আলোচনা করেন মতিউর রহমান। সব প্রটোকলের বাইরে এমন সন্ধিক্ষণে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এরশাদের সঙ্গে লে. কর্নেল মতিউর রহমানের এমন কী ব্যক্তিগত গোপন আলাপ থাকতে পারে? এর কয়েক দিন আগে ঢাকায় গিয়েও মতি এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়া হত্যার কয়েক দিন আগে এরশাদের সঙ্গে মতির দুই দফা আলাপ-আলোচনার বিষয়টি অন্যত্রও উল্লেখ রয়েছে।
জেনারেল মইনুল হোসেনকে ৩০ মে ভোরেই তার সহকর্মী আর্মি হেড কোয়ার্টারের পিএসও জেনারেল নূরউদ্দিন ফোন করে সত্বর সেনাসদরে যেতে বলেন। মইনুল সেনাসদরে গিয়ে দেখেন সেনাপ্রধান আগে থেকেই উপস্থিত রয়েছেন। সামরিক পোশাক পরিহিত এরশাদ ছিলেন ধীরস্থির ও শান্ত। আরেক পিএসও জেনারেল মান্নান সিদ্দিকীসহ (পরে এরশাদের মন্ত্রী) পদস্থ সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত হন সেনাসদরে। সবাই এরশাদের কাছে জানতে চান, এখন কী হবে? সরাসরি উত্তর না দিয়ে এরশাদ সামরিক আইন জারির ইঙ্গিত দেন।
উপস্থিত অফিসাররা জানান, এ সময় সামরিক আইন জারির কোনো যুক্তি বা পরিস্থিতি বিরাজমান নেই। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন ওই সময়। আশ্চর্য হলেও সত্য, ক্ষমতা দখলের উন্মাদনায় ব্যস্ত এরশাদ জিয়া হত্যার বিষয়টি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে অবহিত করেননি। উপস্থিত অফিসাররা বলার পরই এরশাদ হাসপাতালে গিয়ে বিচারপতি সাত্তারকে জিয়া হত্যার কথা জানান। দুদিনের মধ্যে চট্টগ্রামে বিদ্রোহীরা পিছু হটে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার একজন সৎ, মেধাবী, চরিত্রবান ও চৌকস সেনা কর্মকর্তা নিরপরাধ জেনারেল মনজুরকে ঠান্ডা মাথায় এরশাদের নির্দেশে একটিমাত্র বুলেটে হত্যা করা হয়। জিয়া হত্যার সঙ্গে মনজুরের সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা ছিল না। জেনারেল এরশাদকে তার নষ্টচরিত্রের জন্য প্রকাশ্যে ঘৃণা করতেন মনজুর। এরশাদের নামটিও ঘৃণায় উচ্চারণ করতেন না। এরশাদকে বলতেন ‘থিফ’। জিয়া হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেও মনজুরের উপস্থিতিতে এরশাদ নিশ্চিন্ত মনে দেশ শাসন করতে পারত না। আর এ জন্যই মনজুরকে হত্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার বিষয়টি বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্ভবত শুধু কর্নেল মতিই জানতেন। কোনো দিন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত হলে হয়তো জানা যাবে চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ছিল এরশাদের সাজানো ও পরিকল্পিত একটি বিদ্রোহ। আর্মির মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা, অপসারণ ও বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করে সর্বস্তরে অমুক্তিযোদ্ধাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই ছিল জিয়া-মনজুর হত্যার মূল লক্ষ্য। ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ ১৩ জনকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সাজানো কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে গোপন বিচারে ফাঁসি দেয়ার পরপর ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে বিভিন্ন অজুহাতে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ওই তথাকথিত বিচারের সঙ্গে জড়িত বিচারকসহ অন্যরাও ইতিহাসের আদালতে খুনি হিসেবে চিহ্নিত হবেন। বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা অফিসার পরিস্থিতির চাপে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য হন। মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল শওকত আলীকে অবসরে পাঠানো হয়, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দীন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল মইনুলসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে সর্বদা সেনা গোয়েন্দারা লেগে থাকত। এরশাদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অজুহাতে বিদায় করে দিয়ে সবস্তরে অমুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
জিয়া হত্যার ১০ মাসের মাথায় দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সামরিক আইন জারি করে ১০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখেন এরশাদ। দীর্ঘ ৪০ বছরেও জিয়া-মনজুর হত্যার প্রকৃত বিচার হয়নি। কারণ, এরশাদের নির্দেশে তথাকথিত বিচারের মাধ্যমে যে ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয় এটা ছিল বিচারের নামে ঠান্ডা মাথায় আরেকটি হত্যাকাণ্ড। জিয়া-মনজুরকে হত্যা না করলে এরশাদ কোনো দিনই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারতেন না।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, জিয়া হত্যার পর তার দল বিএনপি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করেননি। অবশ্য জিয়া হত্যার পর এরশাদ বাড়ি-গাড়ি, অর্থসহ জিয়া পরিবারকে অস্বাভাবিক সুবিধা প্রদান করে। জিয়া-মনজুর হত্যার বিচার এবং মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা, অপসারণ, অবসর, হয়রানি-নির্যাতনের বিষয়টি উদ্ঘাটনের জন্য ট্রুথ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। জিয়া-মনজুর হত্যার বিচার হলে এবং ট্রুথ কমিশন তদন্ত করলে ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য যেমন উদ্ঘাটিত হতো, তেমনি কথিত বিচারে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা তাদের হারানো সম্মান ফিরে পেতেন।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।
এই নিবন্ধ লেখার ব্যাপারে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রমের ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য- ‘স্বাধীনতার প্রথম দশক’, কর্নেল এম এ হামিদের ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, মুনতাসীর মামুনের ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি- দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা’, জিয়া হত্যার সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিনের ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড আফটারমাথ’ (জিয়াউর রহমান হত্যা ও তারপর), পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ (বাংলাদেশ : একটি রক্তাক্ত অধ্যায়), গবেষক ও লেখক এএসএম সামছুল আরেফিনের ‘জিয়া-মনজুর হত্যাকাণ্ড ও তারপর’সহ আরও কিছু গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকার সহযোগিতা নেয়া হয়েছে।
তারেক ও জোবাইদার দুর্নীতির মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে হাইকোর্টে
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের করা মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে, তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের করা রিটের চূড়ান্ত শুনানির দিন পিছিয়ে আগামী ৫ জুন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। তারেক-জোবায়দা বিদেশে পলাতক থাকা অবস্থায়, আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন কি না, সে বিষয়েও ওইদিন শুনানি হবে।
তাদের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে,বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চ রবিবার এই তারিখ ধার্য করেন।
অন্যদিকে, ওয়ান ইলেভেনের সময়, অবৈধ সম্পাদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের করা মামলা বাতিল চেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের করা আবেদনের শুনানির জন্যও সময় নিয়েছেন আসামিপক্ষ।
রবিবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ মামলায় সময় পিছিয়ে ৫ জুন ধার্য করেন।
আদালতে তারেক-জোবাইদার পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আর, শামীম ইস্কান্দারের পক্ষে সময় আবেদন করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। দুদকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশিদ আলম খান।
তারেক-জোবায়দা
জানা যায়, ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ঘোষিত আয়ের বাইরে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬১ টাকার মালিক হওয়া ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা করা হয়। মামলায় তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও শাশুড়ি ইকবাল মান্দ বানুকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে, একই বছরে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী পৃথক রিট আবেদন করেন। রিটে জরুরি আইন এবং এ মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন। হাইকোর্ট রুল জারি করে স্থগিতাদেশ দেন। এরপর, রিট মামলাগুলো গত ২০ এপ্রিল কার্যতালিকায় আসে। পরে রুল শুনানির জন্য ২৯ মে দিন ঠিক করেন হাইকোর্ট।
আদালতে তারেক রহমান ও জোবাইদার পক্ষে তাদের আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেয়ায়, দুদকের আইনজীবী প্রশ্ন তুলে বলেন, পলাতক থাকা অবস্থায় তারেক রহমান ও জোবায়দা রহমান আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। তখন আদালত বলেন, পলাতক থাকা অবস্থায় তারেক রহমান ও জোবাইদা রহমান আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন কি না, ৫ জুন এ বিষয়েও শুনানি হবে।
এদিকে, একই মামলার বৈধতা নিয়ে আরেকটি ফৌজদারি আবেদন করেছিলেন ডা. জোবাইদা। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে, রুল জারি করেছিলো হাইকোর্ট। ওই রুলের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে, মামলা বাতিলে জারি করা রুল খারিজ করে দেয়া হয়। একইসঙ্গে জোবায়দা রহমানকে আট সপ্তাহের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন জোবায়দা রহমান। যা গত ১৩ এপ্রিল খারিজ করেন আপিল বিভাগ।
শামীম ইস্কান্দার ও তার স্ত্রী
সম্পদের তথ্য চেয়ে ২০০৭ সালে শামীম ইস্কান্দারকে নোটিশ দেয় দুদক। নোটিশের পর সম্পদের তথ্য গোপন করায়, তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ২০০৮ সালে রমনা থানায় মামলা করে দুদক। এ মামলায়, হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিনও নেন শামীম ইস্কান্দার ও তার স্ত্রী। ২০১৬ সালে এ মামলা বাতিল চেয়ে, শামীম ইস্কান্দারের আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। এরপর আবারও মামলা বাতিল চেয়ে, আপিল বিভাগে আবেদন করেন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই ও তার স্ত্রী। এর আগে, গত ১৭ এপ্রিল শুনানির দিন পিছিয়ে, ২৯ মে নির্ধারণ করেছিলেন আপিল বিভাগ। তারই ধারাবাহিকতায়, রবিবার এ বিষয়ে শুনানির জন্য ওঠে। পরে, শামীম ইস্কান্দারের পক্ষে সময় আবেদন করেন তার আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। এরপর, শুনানির দিন পিছিয়ে ৫ জুন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।











