ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 5

বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির শেয়ার বুকিং কার্যক্রম শুরু: থাকছে সহজ কিস্তি ও আকর্ষণীয় অফার

0

বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে (আইসিসিবি) শুরু হয়েছে ‘বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল’ প্রকল্পের শেয়ার বিক্রি ও বুকিং মেলা। এক হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের এই হাসপাতালটি দুইহাজার শেয়ার থাকবে। তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (টিবিজি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান এই মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আধুনিক স্থাপত্য ও বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নিয়ে বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের নির্মাণকাজের সূচনা হচ্ছে।

আধুনিক ঢাকায় গড়ে উঠতে যাওয়া এ প্রকল্পে থাকবে ১ হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল। এর মাধ্যমে উন্নত ও সমন্বিত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

তিনি বলেন, এস রহমান প্রপার্টিজের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা স্থানীয় জনগণের সেবার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ও সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান আরও বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপ আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে আসছে। বসুন্ধরা মেডিকেল সিটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত চিকিৎসাসেবা ও মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এস রহমান প্রপার্টিজের পাশে থাকবে বসুন্ধরা গ্রুপ।

মেলাটি ​১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলাটি দর্শনার্থী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য খোলা থাকবে। এস রহমান প্রপার্টিজের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ছাড়, সহজ কিস্তি, চিকিৎসা সেবায় ছাড় এবং কার পার্কিংয়ের মালিকানার মতো নানা সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি শেয়ার কিনে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়ি বিজয়ী হওয়ার আকর্ষণীয় সুযোগও রাখা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানটির আয়োজক প্রতিষ্ঠান এস রহমান প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান এস এম শাহিদুর রহমান জানান
হাসপাতাল প্রকল্পের শেয়ার ছাড়াও এতে মেডিকেল শপ ও ডক্টরস চেম্বারে বিনিয়োগ করা যাবে।
​তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ও এস রহমান প্রপার্টিজের অংশীদারত্বে নির্মিত এই আধুনিক হাসপাতালটি  বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশাপাশি সারাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে ও স্থানীয়দের বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উদ্যোক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বারের সভাপতির সঙ্গে বাগবিতণ্ডা, এজলাস ছেড়ে চলে গেলেন প্রধানবিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা

0

তথ্য গোপনের অভিযোগে দুই আইনজীবীকে ৫  লাখ করে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ ঘটনা ঘটে।

শুনানির এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। এই কথা বলা নিয়ে প্রধান বিচারপতি ও বার সভাপতি তর্কে জড়িয়ে পড়েন। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।

পরে এ বিষয়ে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেন, এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে বিনয়ের সঙ্গে বললাম… যে আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না আগের মতো। এ কারণে লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র লইয়ারকে ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা… অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করেন।
​‘তখন প্রধান বিচারপতি বললেন যে, আমি চিফ জাস্টিস হওয়ার পর কি লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে? আমি ওনাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আগে ১১ জন বিচারপতির একটা বেঞ্চ ছিল। তিনটা বেঞ্চ ছিল। তিনটা বেঞ্চে আমরা শুনতাম মামলা। এখন একটা বেঞ্চ এবং একটা মামলায় স্টে হলে… হয়তো ছিল কি ইনজংশন, শুনানি করার পরেই কিন্তু স্টে গ্রান্ট… জামিন বেরিয়ে যায় বা রিটে বলেন। সেখানে শুনানি করতে পারছে না। ​ইভেন চেম্বার জাজে স্টে করলে মামলা হেয়ারিং করতে এক বছর পার হয়ে যায়। আমার নিজের একটা মামলাতে যে বিচারক বিচার করছিল আমরা… যদি দোষী প্রমাণিত হয়, তাহলে হাইয়েস্ট তিন মাস সাজা হতে পারে। আপিল ডিভিশন স্টে করে রাখছে আজকে এক বছর। চারবার আমি চেম্বার জাজকে রিকোয়েস্ট করলাম শুনানি করার জন্য, এই অর্ডারের এগেইন্সটে। শুনানি করতে পারি নাই। এবং শুধু আমার না, সব লইয়ারদের একই অবস্থা’।

সুপ্রিম কোর্ট বার সভা​পতি বলেন, ’আপিল বিভাগে এখানে কোনো মেনশন করা যায় না। কেন মামলাটা উপরে ছিল নিচে নেমে গেল কেন, মেনশন করা যায় না। এবং যেহেতু একটা বেঞ্চ… মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। মামলা শুনানি করতে পারছে না। লইয়াররা তাইলে মামলা হলে সে লইয়ার ইনকাম করবে, কম হোক বেশি হোক নাকি? খুব কম। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। উনি বললেন যে, আমি না… আমি তো লইয়ারদের মামলা কমে গেছে, লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে-আমি বলবই। আমি চিন্তাই করি নাই যে প্রধান বিচারপতি এত রিয়েক্ট করবেন। ওনার তো রাগ, অভিমানের ঊর্ধ্বে ওনার বিচারকের পদ। আর লইয়ারদের প্রতিনিধি হিসেবে অবশ্যই আমার অবলিগেশন আছে… ওনার কাছে লইয়ারদের পক্ষে আবেদন করার। এটা বাস্তব সত্য কথাই তো!’

আপিল বিভাগে কী ঘটেছিল, কেন প্রধান বিচারপতি এজলাস ছাড়লেন এ প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বার প্রেসিডেন্ট মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব আপিল বিভাগে এসে বললেন যে একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।

তখন চিফ জাস্টিস বললেন যে, ‘দেখেন, আমরা সবকিছু দেখে-শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না।’ আদালতের সঙ্গে প্রতারণা, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতোপূর্বেকারের আদেশও ফ্লাউট করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি বললেন, আপনারা এটা বলবেন না। তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, যিনি একজন জাতীয় সংসদ সদস্য, তিনি বলে ফেললেন যে, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টা মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিয়ে তারপর বললেন, ‘আপনি কি এটা মিন করেন?’

“​মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব তখনও অনেকটা সেই একই কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তখন মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, আপনি যে কথাটা বলেছেন সেটা অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি উঠে গেছেন।”

উল্লেখ্য, নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত একই ঘটনায় একাধিক রিট মামলা করায় তথ্য গোপন এবং প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট দশ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আপিল বিভাগ এ জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩০ দিনের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। নুর আলম পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহাবুব উদ্দিন খোকন। অপর নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদ পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অনীক আর হক, সিনিয়র আইনজীবী মো. শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সরকারি ভ্রমণ বিল নিয়ে নতুন নির্দেশনা

0

সরকারি কাজে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভ্রমণের বিল পরিশোধ এবং অগ্রিম অর্থ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এখন থেকে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র যথাযথভাবে দাখিল না করলে ভ্রমণ বিলের অর্থ ছাড় করা হবে না।
৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি প্রয়োজনে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা দেশের ভেতরে এবং বিদেশে বিভিন্ন সময় সফর করেন। এসব সফরের ব্যয় মেটাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রিগণ বিষয়ক ইউনিট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সফরের আগে অগ্রিম অর্থ বরাদ্দ কিংবা সফর শেষে প্রকৃত ব্যয় পরিশোধের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বিল পাঠায়।
তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে সংযুক্ত না থাকায় অনেক সময় বিল পরিশোধে জটিলতা দেখা দেয়। এ ধরনের সমস্যা দূর করা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নতুন পরিপত্রে প্রমাণপত্র দাখিলসহ বেশ কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে ভ্রমণকারী মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত বিলের সঙ্গে নির্দিষ্ট কাগজপত্র দিতে হবে। বৈদেশিক সফরের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান অনুমোদিত সারসংক্ষেপের কপি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে জারি করা অফিস আদেশের কপি জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া যাতায়াত ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভাড়ার প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখ করা টিকিট, আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে টিকিটের সঙ্গে বোর্ডিং পাস এবং অনুমোদিত ভ্রমণ বিবরণী ও সফরসূচি দিতে হবে। আবাসিক হোটেলে অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিশোধিত বিলের মূল কপি বা প্রমাণকও জমা দিতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রায় কোনো ব্যয় করা হলে বিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের বিনিময় হারের বিবরণী দিতে হবে। অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ভাউচার বা প্রমাণপত্র সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অনুমোদিত সময়ের অতিরিক্ত সফর হলে নিতে হবে নতুন অনুমোদন
পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, সরকারপ্রধান অনুমোদিত সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা ভ্রমণকাল শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময় সফরে থাকতে হলে পুনরায় অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ অনুমোদিত সময়ের বাইরে কোনো সফর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।
অগ্রিম অর্থের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। সফরের জন্য অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পর সফর শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে অগ্রিম সমন্বয়ের বিল দাখিল করতে হবে।
কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর আগের সফরের অগ্রিম অর্থ নির্ধারিত সময়ে সমন্বয় না হলে তার পরবর্তী সফরের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বিল প্রক্রিয়াকরণ ও অর্থ ছাড়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে সংশ্লিষ্টদের বিল জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিন সেট বিল জমা বাধ্যতামূলক
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিল দাখিলের সময় মূল কপিসহ মোট তিন সেট বিল জমা দিতে হবে। বিলের সঙ্গে দেওয়া সব ফটোকপি অবশ্যই যথাযথভাবে সত্যায়িত হতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে নতুন পরিপত্রটি জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত বছরের ৪ মে জারি করা সংশ্লিষ্ট পরিপত্রটি প্রতিস্থাপিত হবে। নতুন নির্দেশনাটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে।

বসুন্ধরার ঋণের অর্থে ঘুরছে সংসারের চাকা, স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা

0


ছবি- সংগৃহীত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে দরিদ্র নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সুদ ও সার্ভিস চার্জমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন।

সোমবার দুপুরে উপজেলার জগন্নাথপুর আধুনিক মিলনায়তনে আয়োজিত ৮৪তম ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানে ৪২৬ জন নারীকে মোট ৮০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খান এবং বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ময়নাল হোসেন চৌধুরী উপকারভোগীদের হাতে ঋণের অর্থ তুলে দেন।

বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন ২০০৫ সাল থেকে বাঞ্ছারামপুরে সুদ ও সার্ভিস চার্জমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফাউন্ডেশনের এই কার্যক্রম বাঞ্ছারামপুরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নবীনগর ও কুমিল্লার হোমনা উপজেলাতেও বিস্তৃত হয়েছে। গত ২১ বছরে তিন উপজেলার ১০১টি গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার দরিদ্র নারী এ ঋণ কার্যক্রমের আওতায় এসেছেন বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

ঋণ পাওয়া নারীদের কয়েকজন জানান, তাঁরা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন আয়মূলক কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করছেন। এতে পরিবারের আয় বাড়ার পাশাপাশি তাঁদের নিজেদেরও আর্থিক সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

দুর্গারামপুর গ্রামের কুলসুম জানান, তিনি এর আগে তিনবার বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করেছেন। প্রতিবারই লাভ করেছেন। তবে মেয়ের বিয়ে ও ছেলের পড়াশোনার খরচে সেই অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। এবার চতুর্থবার ঋণ নিয়ে আবারও আয়মূলক কাজে বিনিয়োগ করতে চান তিনি।

আসাদনগর গ্রামের পারভীন আক্তার বলেন, কয়েক বছর ধরে তিনি ফাউন্ডেশনটির কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিচ্ছেন। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তাঁর ঋণ নেওয়া শুরু হয়েছিল। এবার তিনি ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন। কৃষিকাজ ও হাঁস-মুরগি পালন করে তিনি পরিবারে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন।

পাড়াতলি গ্রামের মোমেনা আক্তার এবারসহ পাঁচবার ঋণ পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ঋণের অর্থ দিয়ে গরু-ছাগল পালন করে পরিবারের আয় বাড়াতে পেরেছেন।

আসাদনগর গ্রামের হালিমা বলেন, তিনি ঋণের টাকা স্বামীর অটোরিকশার দোকানে বিনিয়োগ করেছেন। দোকানের লাভ থেকে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছেন। এতে তাঁদের সংসারে আর্থিক স্বস্তি এসেছে।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খান বলেন, উচ্চ সুদের ঋণ দরিদ্র মানুষের জন্য অনেক সময় দারিদ্র্যের চক্র আরও জটিল করে তোলে। ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বসুন্ধরা ফাউন্ডেশনের সুদমুক্ত ঋণ কার্যক্রম দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

তিনি বলেন, তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ এই ঋণ ব্যবস্থা উপকারভোগীদের অর্থ আয়মূলক কাজে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়। ফলে তাঁরা তাৎক্ষণিক ঋণ পরিশোধের চাপ ছাড়াই ব্যবসা বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারেন।

বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ময়নাল হোসেন চৌধুরী বলেন, সুদ ও সার্ভিস চার্জ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মাধ্যমে বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন একটি মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিন উপজেলার প্রায় ৩১ হাজার নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ঋণের অর্থ বৈধ ও আয়মূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি ঋণগ্রহীতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুদ ও সার্ভিস চার্জমুক্ত ঋণের পাশাপাশি বসুন্ধরা ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগও এলাকার দরিদ্র মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। অনেক নারী প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন পেয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রেও বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মো. চাঁনমিয়া সরকার। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা ফাউন্ডেশনের ডিজিএম মাইমুন কবির, ডেপুটি ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন, শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিচারকদের আবাসন সংকট দূর করতে জেলায় জেলায় বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ

0

দেশের ৬৪ জেলা ও ৮ মহানগরে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আবাসন সংকট নিরসনে আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানভেদে প্রতিটি কমপ্লেক্স ১০ থেকে ১৫ তলা বিশিষ্ট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এজন্য প্রয়োজনীয় জায়গা চিহ্নিত করে স্থানিক নকশা পাঠাতে গত ২ সেপ্টেম্বর জেলা ও দায়রা জজদের নির্দেশ দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে চিঠিতে নির্বাচিত স্থানগুলোর ডিজিটাল সার্ভেসহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে প্রতিটি জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং বিভিন্ন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন স্তরের ৩০ থেকে ৫০ জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। তবে কয়েকটি জেলা ছাড়া অধিকাংশ জেলায় বিচারকদের জন্য সমন্বিত বা পর্যাপ্ত সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা নেই।‌ ফলে অধিকাংশ বিচারককে ভাড়া বাসায় বসবাস করতে হয়।
স্পর্শকাতর মামলা পরিচালনার কারণে ভাড়া বাসায় বসবাস বিচারক ও তাদের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন ও বিচার বিভাগ বলছে, অনেক স্থানে জেলা জজশিপের আওতায় আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। এসব জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিটি জেলা ও মহানগরে বহুতল আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলে বর্তমান আবাসন সংকট নিরসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বর্ধিত চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, একক আবাসিক ভবনে সিসিটিভি, নির্দিষ্ট প্রবেশপথ এবং সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা তুলনামূলক সহজ হবে। এতে বিচারক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।

এ অবস্থায় ‘৬৪ জেলা এবং ৮টি মহানগরের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ভবন নির্মাণের জন্য জায়গা চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে।
জেলা ও দায়রা জজদের তাদের আওতাধীন আদালত প্রাঙ্গণ অথবা পুরাতন কোর্ট ও মুন্সেফ কোর্ট প্রাঙ্গণে কী পরিমাণ জায়গা রয়েছে, তার বর্ণনা ও স্থানিক নকশা পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে জেলা জজ আদালত ভবনের এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের উপযোগী জায়গার ধারণা দেওয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি খাত: উন্মুক্ত হচ্ছে দেশের জ্বালানি বাজার

0

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই  জ্বালানি সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারি নীতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এত দিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) একচ্ছত্রভাবে তেল আমদানি, বণ্টন ও খুচরা বিক্রির কাজ করে আসছে। এই একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পেট্রোলিয়াম ব্যবসার সুযোগ দিয়ে একটি নতুন নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব বিপিসিকে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি মজুত করার সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি খাতের বিদ্যমান অবকাঠামো ও বিনিয়োগের পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে।

বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করা হয়। এর সিংহভাগই বিপিসি নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি উৎপাদন করলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রির অনুমতি নেই—উৎপাদিত তেল বিপিসির কাছেই বিক্রি করতে হয়। শুধুমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজস্ব ফার্নেস ওয়েল আমদানি করতে পারে। বিপিসির এই দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রভাবে তেল চুরি, অপচয় ও ভেজালের মতো অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। বেসরকারি খাত যুক্ত হলে একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যেমনটি দেখা গেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতে, যেখানে ৯৮ শতাংশ চাহিদাই বেসরকারি খাত পূরণ করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবি-র উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশগ্রহণে বাজার উদারীকরণ করা ইতিবাচক, তবে এর সুফল যেন সাধারণ ভোক্তারা পান, সেজন্য কঠোর সরকারি তদারকি প্রয়োজন। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিপিসির বদলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে দেওয়া উচিত। ইতোমধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপসহ অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি খাতে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

ডিসেম্বরের হিসাব-নিকাশ ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ

0

যদি গণতন্ত্র মানি তবে বলতেই হবে রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণ ভোটের মাধ্যমে যাকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিবে তারাই একটি দেশের বৈধ সরকার। তারা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করবেন এটাই গণতান্ত্রিক রীতি এবং নীতি।
জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যে পতন ঘটাবেন বলে কেউ বা কোন রাজনৈতিক দল সময় বেঁধে দিবেন এটা গণতান্ত্রিক রীতি নীতির বিপরীত। অতি সম্প্রতি ১১ দলীয় জোট ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে। এটি কেবলমাত্র একটি সাধারণ বিরোধী কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক স্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজপথের দীর্ঘ বহর, বিশাল জনসমাগম এবং মঞ্চের বক্তব্যগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফেনীর মহিপালে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যখন ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ শোনার কথা বলছেন, তখন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আরও এক ধাপ এগিয়ে পতন ঘটাতে ‘ডিসেম্বর’ মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জোটের নেতাকর্মীদের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে বা সাংবিধানিক মেয়াদ শেষে সরকারের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু রাজপথের সমাবেশ থেকে ‘সরকার পতনের মাস’ ঘোষণা করা প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—রাজনীতিতে এই ‘ডিসেম্বর’-এর আসল অর্থ কী?
দাবি ও রাজপথের পদ্ধতিঃ
১১ দলীয় জোটের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির অনেকগুলোই জনজীবনের বাস্তব সংকটের সঙ্গে যুক্ত—যেমন জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। এসব জনদাবি কোনো দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
তবে মূল প্রশ্নটি এখানে দাবি নিয়ে নয়, দাবি আদায়ের পথ নিয়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আন্দোলন বা প্রতিবাদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু রাজপথের এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ কি নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া জাতীয় ম্যান্ডেটের বিকল্প হতে পারে? এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম যখন ৬ দফাকে ‘এক দফায়’ রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দেন, কিংবা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাজপথের শক্তি প্রদর্শন করে কি একটি নির্বাচিত সরকারের বিদায়ের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব?

জনসমাগম বনাম ভোটের বাক্সঃ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কর্মসূচিতে জোটটির সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় নিশ্চিতভাবেই স্পষ্ট হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় জনসমাবেশ দিয়ে জনমতের একাংশের আবেগ ফুটিয়ে তোলা নতুন কিছু নয়। তবে মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটারের উপস্থিতি আর সারা দেশের ভোটের বাক্স এক বিষয় নয়। রাজপথের সাফল্যকে পুরো দেশের একমাত্র কণ্ঠস্বর মনে করার মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকে।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারকে পরাজিত করা আর অনবরত আন্দোলনের চাপে টেনে নামানোর মধ্যে একটি মৌলিক ফারাক রয়েছে। এই সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দ বন্ধ ও দায়বদ্ধতাঃ
প্রশাসনিক দলীয়করণ কিংবা বিদ্যুৎ সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক যেকোনো ব্যর্থতা বা নীতিগত মতপার্থক্যকে ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ আখ্যা দিলে শব্দটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য হারিয়ে যায়। যারা আজ ক্ষমতার বাইরে থেকে কর্তৃত্ববাদের অভিযোগ তুলছেন, তাদের কাছেও জনগণের প্রশ্ন থাকে—ক্ষমতায় গেলে তাঁরা কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করবেন, নাকি পুরনো ব্যবস্থার ভেতর শুধু নতুন মুখের রূপান্তর ঘটবে?
জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানঃ
বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। আইনগতভাবে রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণই গণতান্ত্রিকতার একমাত্র প্রমাণ নয়; তা অর্জিত হয় ধারাবাহিক রাজনৈতিক আচরণের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ইতিহাস দলটির জন্য একটি বাড়তি রাজনৈতিক দায় তৈরি করে। জামায়াতকে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়, তবে ক্ষমতায় না গিয়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের স্বচ্ছতার প্রমাণ দেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরু থেকেই পরিবারতন্ত্র ও দখলদারিত্বের রাজনীতির বাইরে এসে ‘নতুন রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন তারা জামায়াতসহ পুরনো ধাঁচের জোটের সঙ্গে রাজপথে হাঁটছে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—রাজনৈতিক কৌশলের নামে সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে ‘নতুন রাজনীতির’ স্বকীয়তা কোথায় রইল?
বাইরের প্রভাবের শঙ্কাঃ
সামগ্রিক এই অস্থিরতার মধ্যে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক প্রভাবের বিষয়টিও উঠে আসছে। অতীতে মালয়েশিয়ার পিএএস (PAS) নেতা হাদি আওয়াংয়ের দেওয়া বিদেশি হস্তক্ষেপের মন্তব্য কিংবা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নানা আলোচনা সার্বভৌমত্বের ওপর বৈশ্বিক প্রভাবের ঝুঁকি মনে করিয়ে দেয়। দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার পথ কেমন হবে, তা বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণভাবেই নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।।
তাই বলা যায়, অলি আহমদের করা ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ডিসেম্বরে কোনো পরিবর্তন আসবে, নাকি এটি অতীতের অন্যান্য রাজনৈতিক হুমকির মতোই রয়ে যাবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে ডিসেম্বরের রাজনৈতিক ফলাফলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো পদ্ধতির। গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনের আগেই যদি রাজপথে ফল নির্ধারিত হয়ে যায় আর নির্বাচন কেবল তাতে আনুষ্ঠানিক সীলমোহর দেয়, তবে ক্ষমতার আসল সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে—জনগণ, নাকি রাজপথ? আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই।

জ্বালানি নিরাপত্তার রোডম্যাপে বড় প্রকল্প, অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন

0

বিদ্যুৎ-গ্যাস খাত সংস্কারে নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, আমদানি ও নতুন বড় প্রকল্পেই বেশি ঝোঁক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাঁচ বছরের জন্য বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে বাড়ানো হবে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা। নির্মাণ করা হবে গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নেয়া হবে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোডম্যাপে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা কী, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার বিষয়টি সামনে রেখে জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন অবকাঠামো ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই সরকারের ঝোঁক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।

কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় এসব নতুন বড় প্রকল্প ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের সমাধান শুধু নতুন প্রকল্প নির্মাণে নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেখানে সংস্কার করাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।

দেশের গ্যাস চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়বে। একইভাবে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিদেশী প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থাকবে। আর এ ধরনের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক বাজার। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর জ্বালানি সংকটই এর বাস্তব উদাহরণ। গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গত কয়েক বছরে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করা প্রয়োজন ছিল। অথচ নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সে নির্ভরতা আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দক্ষতা উন্নয়ন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। এসব সংস্কার ছাড়া শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় ও আর্থিক ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে নিজস্ব গ্যাস। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে নেয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে দেশে কোথায় কী পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে, কত দ্রুত তা অনুসন্ধান করা সম্ভব এবং বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।

দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ৬ শতাংশ হারে বাড়বে। ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন হিসাব করলে আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা দাঁড়াবে ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে। এ সক্ষমতা ব্যবহারের পরও অতিরিক্ত সক্ষমতা বসে থাকবে বিদ্যুৎ খাতে। এর পরও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের রোডম্যাপেই বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার জন্য পরিশোধ করতে হচ্ছে অর্থ। এতে বিদ্যুৎ খাতের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ।

এ পরিস্থিতিতে আরো নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগে বিদ্যমান অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে কমানো হবে, কোন কেন্দ্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো বন্ধ বা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা পুরনো সমস্যার সমাধান না করেই নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ এবং কম খরচের জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত না করলে এ ব্যয় কমানো কঠিন হবে। তাই নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সক্ষমতার বোঝা কীভাবে কমানো হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে হলে প্রথমেই একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংস্কার দরকার। অতীতে আমরা বারবার এ কথা বলেছি। কিন্তু সে সংস্কার এখনো হচ্ছে না। এখানে সংস্কার শুধু প্রয়োজনীয়—এমন নয়; আমি মনে করি, সংস্কার এখন একেবারেই জরুরি। বিশেষ করে আমরা যে সংকটের মধ্যে আছি, সে পরিস্থিতিতে সংস্কার শুরু করা দরকার। এ রোডম্যাপ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক) হয়তো ভালো সময়ের জন্য করা হয়েছে। কারণ এখানে জরুরি ভিত্তিতে কীভাবে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা যায়, সেটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে সংস্কারকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একদিকে আমাদের তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিকে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও করতে হবে।’
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আর্থিক দুর্বলতা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরের পর বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে থাকায় সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারকে নিয়মিত বড় অংকের অর্থ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিপিডিবিও সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য পক্ষের বিল পরিশোধ করছে। এ অবস্থায় শুধু নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ সক্ষমতা বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ অর্থ প্রতিবছর ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুতে ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী। বাপেক্সের সাবেক এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ব্যয় বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় নেয়া হয়নি। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়, তা নিশ্চিত করা। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে ব্যয় আরো বাড়বে এবং সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নও জটিল হয়ে উঠবে।’

নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে সরকারের সাবেক এ আমলা বলেন, ‘দেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পে ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে নতুন করে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কিনা, সেটিও আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের রোডম্যাপে খুলনা ও বরিশালে আরো দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এসব অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিদ্যমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও আমদানি বাড়লে ভবিষ্যতের আর্থিক দায় কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের ব্যয় এরই মধ্যে বছরে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ আরো বাড়লে এ ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিতে সরকারের ভর্তুকিও গত বছরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি বাবদ আরো প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাই বিপুল এ আমদানি ব্যয় এবং এলএনজি অবকাঠামোর উচ্চ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন টার্মিনালের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের।

দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে দ্বীপ জেলার এ গ্যাস ব্যবহার করতে সেখানে নতুন করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যেত, আবার ভোলার গ্যাসও দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হতো।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এ সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিপিডিবির ব্যয় কাঠামো, জনবলের দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, এটি ইতিবাচক। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বড় আকারে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদের দক্ষতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত জনবল রয়েছে। বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কারণ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরো বড় আকারে কার্যক্রম শুরু হবে, তখন পুরনো এসব লোকবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না। এতে কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’

দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এরই মধ্যে সারভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা, নেট মিটারিং সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ক্রয়ের মতো পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সরকারে নীতি ও করহারে বড় সুবিধা দিয়েছে। তবে সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি, সক্ষমতা বৃদ্ধি নতুন করে জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হুমকি হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই।

জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে আরো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ টেকসই পরিকল্পনা নয়। অতীতে নির্মিত এসব অবকাঠামোর ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপই এখন বহন করতে হচ্ছে। অর্থ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যমান সক্ষমতারও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি নেই।’

হাসান মেহেদীর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এজন্য জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে রাশিয়ার অর্থায়নে। ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ কেন্দ্রটি এখনো উৎপাদনে আনা যায়নি। শুরুতে ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরেও দফায় দফায় কেন্দ্রটির উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি চলতি বছরে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ কেন্দ্র পরিচালনা, কেন্দ্রটি উৎপাদনে জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, এমনকি বিপুল এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা যাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এমন পরিস্থিতির ভেতরে সরকারের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপরিকল্পিত চিন্তা বলে মনে করেন সরকারের সাবেক কর্মকর্তারাও।

সরকারের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি অগ্রাধিকার নির্ধারণের রূপরেখা বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এটা যে এ কৌশলপত্রে বলতে হবে এমনটিও মনে করেন না তারা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমরা কিছু বলিনি। এ ফ্রেমওয়ার্কে মূলত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি গাইডলাইন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এসব কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলাদা খাতভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো আরো বিস্তারিতভাবে সামনে আসতে পারে। তখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কোন ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। আবার শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ বা সংস্কার করলেই যে দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দক্ষতা, সমন্বয় এবং সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার প্রয়োজন হলে সেটাও করতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ

0

 


বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত বাজেট বরাদ্দ, বিচারপ্রার্থী জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার, ন্যায্য বিচার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার।
৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে জনস্বার্থে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ও ই-মেইলে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব তাদের রয়েছে এবং আদালতের কর্মকর্তা হিসেবে তারা সংবিধান লঙ্ঘন রোধেও শপথবদ্ধ। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছাড়া তা কার্যকর হওয়া সম্ভব নয় বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের জন্য অপর্যাপ্ত বরাদ্দ:

নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য মাত্র ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭০ কোটি টাকা। অথচ দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য।

আইন মন্ত্রীর স্বীকারোক্তি—”সবচেয়ে অবহেলিত খাত”:

নোটিশে আইন মন্ত্রী জনাব মোঃ আসাদুজ্জামানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি সমগ্র বিচার বিভাগকে “সবচেয়ে অবহেলিত খাত” হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ মাত্র ২,২০০ কোটি টাকা—যেখানে একা বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্যই বরাদ্দ ২,৫০০ কোটি টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪,০০০ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ ১৭ কোটিরও বেশি নাগরিকের ন্যায়বিচারের দায়িত্বে থাকা সমগ্র বিচার বিভাগের বরাদ্দ একটি মাত্র সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়েও কম, যা আইন মন্ত্রী নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই রাষ্ট্রের অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

আইন ও বিচার বিভাগের বরাদ্দ:
নোটিশ অনুযায়ী, ২,২০০ কোটি টাকার এই অংকের বড় অংশই ব্যয় হয় আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে অধস্তন আদালতের বেতন-ভাতা, প্রশাসন, অবকাঠামো এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবন নির্মাণ, ই-জুডিশিয়ারি স্বয়ংক্রিয়করণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত সম্পদ এর ব্যাপ্তি, মামলাজট ও সাংবিধানিক গুরুত্বের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার ইতিহাস:
নোটিশে বলা হয়, বিচার বিভাগের প্রতি এই অবহেলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দুই দশক ধরে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র ০.৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এবং কোনো কোনো বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ শূন্যও ছিল, অথচ উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বিচার বিভাগের রাজস্ব অবদান:

নোটিশে বলা হয়, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের বোঝা নয় বরং কোর্ট ফি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক, প্রসেস ফি ও জরিমানার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করে থাকে। তবে নোটিশে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগের প্রকৃত মোট রাজস্ব আয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ও পৃথক সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না, যা নিজেই রাষ্ট্রের অমনোযোগিতার একটি প্রমাণ। এ বিষয়ে একটি পৃথক ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে নোটিশে।

আইনজীবীদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাব:
পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং লাইব্রেরি সুবিধার তীব্র ঘাটতি রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও একই কারণে ভিড়, বিলম্ব ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছেন বলে জানানো হয়।
মামলাজট ও বিলম্বের পরিণতি:

অপর্যাপ্ত বরাদ্দের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী মামলাজট, বিচারক-মামলার অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাত, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব সৃষ্টি হচ্ছে বলে নোটিশে বলা হয়, যা বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।

জাতীয় পর্যায়ে মামলাজটের ব্যাপকতা:
নোটিশে সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানানো হয়, দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন, যা কেবল বিচারিক নয়, একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে জনগণের আস্থা কমছে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা ও বিচারপতি-মামলা অনুপাত:
নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার ১২০টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল। বর্তমানে আপিল বিভাগে মাত্র ৬ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০৩ জন (৭৭ জন স্থায়ী ও ২৬ জন অতিরিক্ত) বিচারপতি কর্মরত আছেন—অর্থাৎ প্রতিটি বিভাগে গড়ে প্রতি বিচারপতির বিপরীতে ৫,০০০-এরও বেশি মামলার বোঝা রয়েছে, যা দ্রুত ও ন্যায্য বিচারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে নোটিশে দাবি করা হয়।
বিচারপতি সংকট ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ:
নোটিশে বলা হয়, রাষ্ট্র নিজেই গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন অধস্তন আদালতে বিচারপতির সংখ্যা প্রায় ২,০০০ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৬,০০০-এ উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। কমিশন আপিল বিভাগে ন্যূনতম ৭ জন বিচারপতি নিশ্চিতকরণ এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দেরও সুপারিশ করেছে। এমনকি বাংলাদেশে প্রতি প্রায় ৯৪,৪৪৪ জনের বিপরীতে মাত্র ১ জন বিচারপতি রয়েছেন, যা প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। তবে কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশ জমা দিলেও এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেটের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করা হয়নি বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে অপর্যাপ্ত বেঞ্চ:
নোটিশে জানানো হয়, হাইকোর্ট বিভাগে বাণিজ্যিক মামলা নিষ্পত্তির জন্য মাত্র ২টি বেঞ্চ কার্যকর রয়েছে, যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা মূল্যমানের বাণিজ্যিক বিরোধ বছরের পর বছর অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে আপিল বিভাগে ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫ জন বিচারপতি কর্মরত, ফলে একাধিক বেঞ্চ পরিচালনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং মামলার সংখ্যা ১৯৭২ সালের ৪,০৫৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৪২,০০০-এ পৌঁছেছে। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত মামলার মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং আপিল বিভাগে মাত্র ১৮ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রমাণ করে বর্তমান অবকাঠামোয় মামলাজট ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
আইনজীবীর সংখ্যা ও চাপ:নোটিশ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ ভোটার তালিকায় ১১,০৯৭ জন আইনজীবী নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন—যা প্রকৃত সক্রিয় আইনজীবীর সংখ্যার একটি রক্ষণশীল হিসাব মাত্র। এত বিপুল সংখ্যক আইনজীবীকে অপ্রতুল অবকাঠামোর মধ্যেই তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বসার ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুবিধার অভাব:নোটিশে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, বিচারপ্রার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুপ্রিম কোর্টের করিডোরে ভিড়ের মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়; এজলাস সংকটের কারণে একই এজলাসে একাধিক বিচারককে পালাক্রমে বসতে হয়; ডিজিটাল মামলা সংরক্ষণাগারের অভাব রয়েছে; এমনকি বিচারিক কর্মকর্তাদের সাধারণ কার্যালয় সরঞ্জামের জন্যও আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করতে হয়। আইন মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, একজন বিচারক সাক্ষ্য গ্রহণের সময় কাগজ শেষ হয়ে গেলে প্রশাসনিক বরাদ্দের অপেক্ষায় বিচারকাজ মুলতবি রাখতে বাধ্য হয়।

সাংবিধানিক লঙ্ঘনের অভিযোগ:নোটিশে বলা হয়, নোটিশ প্রাপকদের এই অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তা সংবিধানের ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার), ৩২ (জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার), ৩৫(৩) (দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার), ২২ (বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ), ৯৪ (সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা), ১১৬ক (বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা), ৪৪ (মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকার) এবং ২১ (সরকারি দায়িত্ব পালনের কর্তব্য) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নোটিশ প্রাপকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত বাজেট বরাদ্দ; আইনজীবীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ; মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে একটি যুক্তিসঙ্গত বাজেট কাঠামো প্রণয়ন; আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারপতি ও বেঞ্চ নিয়োগ; মামলার পরিমাণ, নিষ্পত্তির হার ও দায়েরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় বিচারপতি ও বেঞ্চের সংখ্যা নির্ধারণে একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রকাশ; এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের একটি পৃথক ও স্বচ্ছ বার্ষিক হিসাব প্রকাশের। নোটিশ প্রাপকদের ৩ (তিন) দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে অবহিত করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় সংবিধানের ৭, ২১, ২২, ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৩), ৪৪, ৯৪ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগে জনস্বার্থে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরের কথা নোটিশে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টানাপোড়েন নতুন মাত্রায়

0

একটি চুক্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? আর দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন ঘটলে সেই চুক্তির সুবিধা কি আগের মতো বহাল রাখা সম্ভব? ভারত-পাকিস্তানের ৬৬ বছরের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে এখন এই প্রশ্নগুলোই সামনে এসেছে।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে। এর পরই নয়াদিল্লি ঘোষণা দেয়, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতিকে তারা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখতে চাইছে না।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এবার আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পর চুক্তির আওতায় গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দেয়, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা যায় না বলেও আদালত মত দেয়। একই সঙ্গে ভারতের রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কিছু অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পাকিস্তান এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারা ওই সালিসি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও ওই ট্রাইব্যুনালের নেই বলে মনে করে দেশটি।

এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এখন কেবল পানি বণ্টন বা প্রকল্প নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকট।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারে ভারত অধিকতর অধিকার পায়। একই সঙ্গে উভয় দেশকে নির্দিষ্ট শর্তে একে অপরের নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধ চললেও এই চুক্তি দীর্ঘ সময় কার্যকর ছিল। সে কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে এটিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সফল পানি সহযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই। দুই দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

ভারতের অবস্থানকে সরলভাবে দেখলে মনে হতে পারে, একটি সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় একটি পানি চুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু নয়াদিল্লির যুক্তি এর চেয়ে বিস্তৃত।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামা ও সর্বশেষ পাহেলগাম হামলার মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার সংকটের মধ্যে ফেলেছে। পাকিস্তান অবশ্য ভারতের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ভারতের দৃষ্টিতে, পাহেলগাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতার অংশ। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পানি, বাণিজ্য বা অন্যান্য সহযোগিতাকে নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে নয়াদিল্লি।

এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সন্ত্রাসী হামলা ঘটলেই কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন কোনো সরল আইনি নিয়ম নেই। ভারতও চুক্তিকে চিরতরে বাতিল করার কথা না বলে স্থগিত রাখার কথা বলছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে সহযোগিতার পথ আবার খোলার সুযোগ তারা রাখছে।
আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রকে তা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার জন্য এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আন্তর্জাতিক আইন সব পরিস্থিতিকে এক রকমভাবে দেখে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত, পরিবর্তন বা বাতিলের কিছু আইনি ভিত্তিও রয়েছে। গুরুতর চুক্তিভঙ্গ কিংবা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের মতো বিষয় আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব রাজনীতিতেও দেখা গেছে, জাতীয় নিরাপত্তা বা পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার কারণে রাষ্ট্রগুলো পুরোনো চুক্তি থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে ২০১৯ সালে রাশিয়ার সঙ্গে করা আইএনএফ চুক্তি থেকেও সরে আসে ওয়াশিংটন।

এসব সিদ্ধান্তের আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এগুলো দেখায়, রাষ্ট্রগুলো সব সময় চুক্তিকে পরিবর্তিত বাস্তবতার ঊর্ধ্বে রাখে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো প্রতিশ্রুতি নতুন করে মূল্যায়নের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রয়েছে।

সিন্ধু নদ অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি সাধারণ পানি বণ্টন চুক্তি নয়। পাকিস্তানের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ভারত চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের উদ্বেগ তাই স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, চুক্তির সুবিধা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আর আলাদা করে দেখার মতো অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক নেই।

দ্য হেগের সালিসি আদালতের রায় আইনি বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। আদালত চুক্তিকে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের আইনি প্রভাব নিয়ে অবস্থান জানিয়েছে।
কিন্তু এই রায় দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাস দূর করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কারণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান সংকট শুধু একটি চুক্তির ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাশ্মীর এবং পারস্পরিক আস্থার গভীর সংকট।
ভারতের অবস্থান হলো, পানি সহযোগিতা আবার স্বাভাবিক করতে হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নতি প্রয়োজন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু পানি চুক্তির ধারাবাহিকতা পানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে না। এর সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারত যদি মনে করে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে, তাহলে চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দূর করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। চুক্তিটি একসময় যুদ্ধ ও বৈরিতার মধ্যেও দুই দেশকে পানি সহযোগিতার একটি কাঠামোর মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
পানি বণ্টনের নিয়ম হয়তো চুক্তিতে নির্ধারিত। কিন্তু সেই চুক্তি কার্যকর রাখার জন্য যে রাজনৈতিক আস্থা প্রয়োজন, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু পানির প্রশ্ন নয়। এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা নীতি এবং পারস্পরিক আস্থারও একটি পরীক্ষা।