ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 4

১১ হাজার কোটি টাকা পাচার: তিন মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও আসিফ মাহমুদের সিন্ডিকেট

0

বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সেই সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়ার বিরুদ্ধে উঠেছে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা (আনুমানিক ৯০ কোটি মার্কিন ডলার) পাচারের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিহীন প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে গড়ে তোলা এক ‘মেটিকুলাস’ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ লুণ্ঠন ও ডিজিটাল রুটে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্ত ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও ৪৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট সাম্রাজ্য: সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়া একই সঙ্গে
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা অসম্ভব।  এর উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, তার অধিনস্ত তিনটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অংকের টাকা থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার প্রেক্ষাপট তার অনুকূলেই ছিল। কারণ ওই সময় আমলারা ছিলেন ভীতিকর  অবস্থানে। জনপ্রতিনিধিদেরও উপস্থিতি ছিলনা।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪২,৪৩৩ কোটি টাকা। এর সাথে আওয়ামী সরকারের বাজেটের অবশিষ্ট অংশ যোগ করে মোট ছিল ৪৪,২৪৩ কোটি টাকা।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছিল ২,৪২৩ কোটি টাকা।  শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪৩৮ কোটি টাকা সহ  মোট বাজেট ছিল ৪৭,১০৪ কোটি টাকা। দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি অর্থব্যয়ের একক ক্ষমতায় ভোগ করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তারা জানান, আসিফের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের অঙ্ক ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে এই বিপুল পরিমাণ বাজেট থেকে পরিকল্পিতভাবে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় ছিল না।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুরো দুর্নীতি প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার (“Meticulous Design”) আওতায়।
রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ: স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ছিল না।
আমলাতান্ত্রিক ভয় ও একক নিয়ন্ত্রণ: তৎকালীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা ও আমলারা তটস্থ ছিলেন। এই প্রশাসনিক ভীতিকে কাজে লাগিয়ে আসিফ মাহমুদ নিজের পছন্দের কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে একটি নিজস্ব ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন।
বেনামি টেন্ডার ও ভুয়া প্রকল্প: বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি ও শ্রম কল্যাণের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি এই সিন্ডিকেটের হাতে নেওয়া হয়।
যেভাবে ডিজিটাল রুটে বিদেশে গেল ৯০ কোটি ডলার:
সম্প্রতি অভিযোগ ওঠার পর সজিব ভূইয়ার সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দাবি করেন—একটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে পাচারের নতুন ও আধুনিক কৌশলের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রথাগত হুন্ডির বাইরে ব্লকচেইন বা সরাসরি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বা প্রথাগত হুন্ডি চ্যানেলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সির (Crypto Currency) মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়েছে।
‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ চক্রের ভূমিকা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থ ও প্রযুক্তি খাতে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু বিতর্কিত ‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ এই পাচার প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করেন।
পাসওয়ার্ডভিত্তিক ওয়ালেট: দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে উত্তোলিত কমিশন ও আত্মসাতের টাকা বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তর করে শেষ পর্যন্ত পাসওয়ার্ডভিত্তিক নিরাপদ ‘ক্রিপ্টো ওয়ালেটে’ রূপান্তর করা হয় এবং বিদেশে পাচার সম্পন্ন হয়।
নির্বাচিত সরকারের আমলেও আড়ালের চেষ্টা ও দুদকের তৎপরতা: অভ্যুত্থানের প্রধান স্লোগান ছিল দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থানের পেছনের রূপকার বলে পরিচিত ব্যক্তিদের  বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এই ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সাবেক এই উপদেষ্টাকে ঘিরে তোলপাড় থামেনি। আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে এখনো এই চক্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী সদস্য সরব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
ফাইল ও নথিপত্র জব্দ: আসিফ মাহমুদের দেড় বছরের মেয়াদে গ্রহণ করা সমস্ত মেগা প্রকল্প, দরপত্র নথি, ই-জিপি ফাইল এবং বিশেষ বরাদ্দ সংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করছে দুদক।
ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত: অর্থ হস্তান্তরের রুট শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট যৌথভাবে ডিজিটাল ট্রানজেকশন ট্র্যাকিং শুরু করেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ডিজিটাল অর্থ হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট রুট এবং ফাইলপত্রের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষ হলেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির বিশদ চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ওঠে আসবে।

ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার নিয়ে পুলিশকে সতর্ক করলো হাইকোর্ট, নালিশী মামলা নিয়েও নির্দেশনা

0

ভুয়া ওয়ারেন্ট এর মাধ্যমে গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধে পুলিশ অফিসারকে সেন্ট্রাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানার সত্যতা যাচাই করা এবং পুলিশের আইজিকে এই মর্মে সার্কুলার জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতে নালিশী মামলা দায়েরের সময় বাদি ও আইনজীবীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম এবং বিচারপতি মুরাদ এ মাওলা সোহেল এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সোমবার একটি রিট মামলার শুনানি শেষে  এই রায় ঘোষণা করেন।
ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার মাধ্যমে  ওয়ারেন্ট  ইস্যু করে প্রতিপক্ষকে গ্রেফতার ও হয়রানি করার বিষয় বিভিন্ন মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচ আর পি বি) জনস্বার্থে এই  রিট দায়েরন করেছিলো।
২০১২ সালে গুলশান থানায় জনৈক আরিফ নিয়াজীকে ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে এই রিট দায়ের হয়েছিলো। হাইকোর্ট রুল  জারি করে এবং আরিফ নিয়াজীকে  গ্রেফতারের বিষয়ে গুলশান থানার ওসিকে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলো।
আদালত রায়ে বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে গেলে কেন্দ্রীয় ডাটা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম থেকে সত্যতা যাচাই   করে  তারপরে গ্রেফতারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।  একই সাথে আদালত  পুলিশের মহাপরিদর্শককে আদালতের নির্দেশনা উল্লেখ করে সার্কুলার ইস্যু করে সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানোর  নির্দেশ দেন।  আদালত অপর এক  আদেশে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশনা দেন, সকল জেলা জজ,  মহানগর জজ, সিজিএম,  সিএমএমসহ বিচারকরা যেনো কোনো নালিশি মামলা দায়েরের  সময় বাদি এবং আইনজীবীর পরিচয়  নিশ্চিত হন। এ জন্য আইনজীবীর পরিচয়পত্র এবং বাদীর  এনআইডির কপি মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতে হবে এবং পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
আদালত রায় বলেন যে কোনো নাগরিককে গ্রেফতার করতে হলে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের যে বিধি বিধান রয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে। আদালত বলেন,ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে গ্রেফতার হলে একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন হয়। এই অধিকার  নিশ্চিত করা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। আদালতের মাধ্যমে মানুষ যাতে হয়রানি না হয় সে জন্য কোনো মামলা দায়ের এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
আদালতে শুনানিতে এইচ আর পি বি এর পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন গুলশানের একজন নাগরিক আরিফ নিয়াজীকে ২০১২ সালে তার গুলশানের বাসা থেকে এক ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে গ্রেফতার করে  এবং আদালতে সোপর্দ করার পরে তিনি জানতে পারেন তার বিরুদ্ধে একটি ভুয়া মামলা ও ভুয়া ওয়ারেন্ট হয়েছে। যে আদালতে উপস্থাপন করা হয় ওই আদালতের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি হলে সেখানেও প্রমাণিত হয় ভুয়া মামলার মাধ্যমে গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে  রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে, ভুয়া  ওয়ারেন্টের মাধ্যমে শত্রুতা হাসিলের জন্য অনেক সাধারন মানুষকে হয়রানি করা হয়। এসব সংবাদ সংযুক্ত করে জনস্বার্থে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ একটি রিট পিটিশন  দায়ের করে এবং এ ধরনের ভুয়া ওয়ারেন্ট ও নালিশি মামলা বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা  চাওয়া হয়।

সরকার পক্ষে ডিএ জি জে আর  খান রবিন রুলের বিরোধিতা করে বলেন ইতিমধ্যে সেন্ট্রাল ডাটা সিস্টেম চালু করা  হয়েছে এবং যার কারণে ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে গ্রেফতারের সুযোগ নেই। তিনি বলেন এই মামলাটা যেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ করেনি সুতরাং তার কোনো প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নাই। আদালত এই বক্তব্য গ্রহণ করেন নি।

রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাকে সহযোগিতা করেন এডভোকেট মোহাম্মদ ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী ,  এডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল এবং এডভোকেট নাসরিন সুলতানা। সরকার পক্ষে ছিলেন ডিএজি জে আর খান রবিন  এবং এ এ জি মোহাম্মদ হুমায়ন হোসেন তুহিন।

বিপিসির জ্বালানি আমদানিতে একই সিন্ডিকেটের ছয় সরবরাহকারী; কার্যাদেশ ঘিরে নানা প্রশ্ন

0

সরকার বদলেছে, বদলেছে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামোও। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশও গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতা, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব দীর্ঘদিনের—এমন অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়িক যোগাযোগ সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

বিপিসির নথি, দরপত্র ও কার্যাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড।

সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ একই ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মোট প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানি এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হিসাব অনুযায়ী, এটি মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

তবে শুধু কার্যাদেশের পরিমাণ দিয়ে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম, গুণগত মান, সরবরাহের সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দরপত্রের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রশ্নটি মূলত প্রতিযোগিতার সুযোগ ও সরবরাহের ঝুঁকি নিয়ে।

জুন-আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।

পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া।

এই চার প্যাকেজের মধ্যে তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল ডিজেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার।

পরবর্তী জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এ সময়ে প্রিমিয়াম বাড়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি সরবরাহকারীর সংখ্যা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতাও কি প্রিমিয়াম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে একই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারদর এবং বিপিসির ক্রয়মূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিপিসির নথিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছিল। বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতাও সংকটের সময় সমস্যা বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ বা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন।

যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় যে ভবনে, একই ভবনে এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগের দায়িত্ব, তাঁদের বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং বিপিসির সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে।

তবে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সে বিষয়ে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল।

সরকার জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত আছে কি না তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রের প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে এতে জ্বালানি সরবরাহে দেশের ঝুঁকি কতটা কমছে বা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮০ লাখ টন কয়লা দরপত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

0

রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির মেগা দরপত্রকে ঘিরে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল)–এর চিফ প্রকিউরমেন্ট অফিসার (সিপিও) এস এম জাহিদ হাসান নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্তাবলী ব্যবহারে দ্বিমুখী নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

দরপত্র মূল্যায়নে দ্বিমুখী নীতি ও অস্পষ্টতা
শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটিতে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ড একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। নিরপেক্ষ মূল্যায়নের বদলে একটি বিশেষ মহলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলায় বাকি দরদাতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
​বিতর্কিত ও অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা: ​অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র মূল্যায়নে লিয়্যানেক্স, মোহিত মিনারেলস এবং লোশে শিপিংয়ের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ কয়লা সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সক্ষমতা এবং দরপত্রের কঠিন শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘লিয়্যানেক্স’ প্রয়োজনীয় সব কারিগরি নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রস্তাবে জোরপূর্বক ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
​‘মাইন এমওইউ’ এবং খনির সক্ষমতা সরাসরি যাচাইয়ের দাবি: ​কয়লার উৎস সংক্রান্ত ‘মাইন এমওইউ’ (সমঝোতা স্মারক) যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দরদাতাদের জমা দেওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো শুধুই একটি কাগজ হিসেবে গ্রহণ না করে, সরাসরি কয়লা খনির মালিক বা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করার জোর দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার যেসব খনি থেকে কয়লা আনার কথা বলা হচ্ছে, সেসব খনির প্রকৃত মালিকানা, প্রতিদিনের উৎপাদন সক্ষমতা, কয়লার মান এবং তা নিয়মিত সরবরাহ করার সামর্থ্য খনি কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ই-মেইল ও যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
<span;>​সরবরাহ ব্যর্থতায় জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক ঝুঁকির আশঙ্কা: ​ভুল বা অক্ষম কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি দেওয়া হলে তার মাশুল গুণতে হবে পুরো দেশকে। তারা সময়মতো সঠিক মানের কয়লা যোগান দিতে ব্যর্থ হলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি ব্যাহত হতে পারে। এটি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানবে না, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রতিযোগিতা ধ্বংস এবং ক্ষমতার অপব্যবহার: ​এস এম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী দরদাতারা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো এক অদৃশ্য পক্ষকে সুবিধা দিতে অন্য যোগ্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চক্রান্ত করে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মৌলিক নীতি, স্বচ্ছতা ও মুক্ত প্রতিযোগিতার ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
​রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশ: ​জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’-এর সাথেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
​অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির ছায়া
শুধু দরপত্র জালিয়াতিই নয়, জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর নিজ জেলা নওগাঁয় নদীর কোল ঘেঁষে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও এসব সম্পদ বিবরণী ও মালিকানার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া এখনও চলছে, তবুও অভিযোগের তীর তাঁর দিকেই নির্দেশ করছে।
​স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও নতুন দরপত্রের দাবি
৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লার এই বিশাল চুক্তি নিয়ে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে, তা দূর করতে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটির প্রতিটি ধাপ সর্বসাধারণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
প্রতিটি দরদাতার লজিস্টিক, আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা সমানভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। অভিযোগগুলোর সতত্যা প্রমাণিত হলে বর্তমান দরপত্র বাতিল করে নতুনভাবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ: ​রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই দরপত্রটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, এর সাথে যুক্ত রয়েছে পুরো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর অপপ্রভাবের কাছে দেশের কৌশলগত স্বার্থ বলি দেওয়া যাবে না। তাই কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাইযোগ্য নথি, প্রমাণিত অভিজ্ঞতা ও শতভাগ স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

কারাগারে ঠাঁই নেই অবস্থা: বন্দি এক লাখ ছাড়িয়েছে

0

দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি রয়েছে। প্রায় ৪৬ হাজার বন্দি ধারণের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বন্দির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ হাজারই বিচারাধীন, যা মোট বন্দির প্রায় ৬৭ শতাংশ। ফলে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দির চাপে আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে সংক্রামকসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। বর্তমানে সেখানে বন্দি রয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে বিচারাধীন ৬৮ হাজার ৩৩০ জন এবং কয়েদি বন্দি ৩৩ হাজার ৬৮৭ জন। বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ৬১ হাজার ৩৬৭, ২০২৩ সালে ৫৭ হাজার ৭০০, ২০২৪ সালে ৫৫ হাজার ও ২০২৫ সালে ৫৯ হাজার। <span;>কারা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগার মূলত সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের শাস্তি কার্যকরের জায়গা। কিন্তু সেখানে যদি বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মানুষ দীর্ঘ সময় আটকে থাকেন, তাহলে পুরো কারা ব্যবস্থার ওপরই অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। এ সংকটকে শুধু কারা অধিদপ্তরের সমস্যা হিসেবে না দেখে তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার ব্যবস্থার সমন্বিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে চিকিৎসাসেবায়। বন্দির সংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও হাসপাতাল শয্যার ব্যবস্থা অপ্রতুল।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কারা হেফাজতে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ায় বন্দিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ ও দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা বন্দিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকায় কারাগারগুলোয় মানবাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন গুম তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বন্দিদের দেখভালের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের। আইন অনুযায়ী একজন বন্দির বাসস্থান থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু যখনই কারাগারগুলোয় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি থাকে, স্বাভাবিকভাবে তখন বন্দিরা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান না। এটা মানবাধিকার হরণ। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সব বন্দির জন্যই প্রাপ্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করা, জামিনযোগ্য ও কম গুরুতর মামলায় বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা এবং অপ্রয়োজনীয় আটক কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব বন্দির বিরুদ্ধে মামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন, সেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে কারাগারে বন্দি মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনা জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাবাসের ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম অধিকার রয়েছে, তা অতিরিক্ত বন্দির জন্য উপেক্ষিত হচ্ছে। দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তসহ বিচারিক কাজগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যে ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়, সেই ধাপগুলো বিলম্বিত হচ্ছে। এর প্রভাব কারাগারগুলোয় পড়ছে।’
ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় কারাগারে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন কারা উপমহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) লে. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশেষ করে স্বল্প জায়গায় বেশি সংখ্যক বন্দি অবস্থান করায় তাদের মধ্যে যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, কলেরা ও হামের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে চর্মরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকলে সবার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন।’ সূত্র- বণিক বার্তা।

সুপ্রিম কোর্ট ‘দুর্নীতিমুক্ত’ করার দাবি তুললেন বার সভাপতি ব্যারিস্টার খোকন

0

প্রধান বিচারপতির এজলাস ছাড়ার ঘটনায় আলোচিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন এবার দেশের সব আদালতকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ‘বস্তি’ উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন ।
তিনি বলেছেন, “মামলার তদবিরের দুর্নীতি, লিস্টে আনতে দুর্নীতি, শুনানির দুর্নীতি, কিছু কিছু জুডিশিয়াল অফিসারের দুর্নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টে সব জায়গায়, হাই কোর্টেও লিস্টে আনতে দুর্নীতি—এসব আইনজীবীদের বক্তব্য।
“আপিল ডিভিশন এবং হাই কোর্ট ডিভিশনে এবং সারা বাংলাদেশে প্রত্যেকটা কোর্টের মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে আগামী এক মাসের মধ্যে।”
দুর্নীতিবাজ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্য জায়গায় দুর্নীতি থাকলেও দুর্নীতির বিচার সুপ্রিম কোর্টেই হয়।
“সেখানে বিচারপ্রার্থীদের মামলা করার সময় যদি তদবির করতে হয়, সব জায়গায় টাকা দিতে হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ‘রাজনৈতিক’ বিচারপতিদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠানোর দাবি জানান এ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। আর সমালোচনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেলের সাম্প্রতিক বক্তব্যের।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিচারপতিদের প্রসঙ্গ টেনে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সময়ে অনেক বিচারপতির আচরণ ছিল রাজনৈতিক।
“তারা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বহাল তবিয়তে আছে। তাদের প্রতিটা আচরণ কন্ডাক্ট করে আমি দাবি করি, তাদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে প্রেরণ করা হোক।”
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে থাকা ‘বস্তি’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খোকন বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বস্তি থাকতে পারে না।
আইনজীবীদের বসার ও হাঁটার জায়গা নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আগামী এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের এই প্রিমিজেস থেকে বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে এবং আইনজীবীদের বসার জন্য, কর্মপরিবেশ সৃষ্টির জন্য আপাতত টেম্পোরারি শেড হলেও করে দিতে হবে।”

এক মাসের মধ্যে এসব দাবি পূরণ না হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর দায়-দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বহন করবে না।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন অবকাশকালীন ছুটির পর আপিল বিভাগে কমপক্ষে তিনটি বেঞ্চ গঠন এবং প্রয়োজনে নতুন বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান খোকন।
সম্প্রতি এক জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ প্রত্যাহার না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে খোকন বলেন, এ বিষয়ে আইনজীবীরা আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
মঙ্গলবার  আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেয়। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা (কস্ট) করা হয়।
জরিমানার টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদেশ দেওয়ার সময় আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ আদালতে ছিলেন। তবে তার সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে এসব মামলায় যুক্ত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তখন আদালতে ছিলেন না।
দুপুরের পর এজলাসে গিয়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতির কাছে ওই নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন।
তার ভাষ্য ছিল, একজন জুনিয়র ল’ইয়ার হিসেবে ৫ লাখ টাকা ‘কস্ট’ অনেক বেশি হয়ে গেছে, এটা মাফ করে দেওয়া দরকার।
ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়া এবং এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন।
সেই ঘটনা বর্ণনা করে ব্যারিস্টার খোকন সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে বললাম, যে আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।”
খোকনের দাবি, তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে মামলার শুনানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানো।
তবে প্রধান বিচারপতি তখন খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে–এমন কিছু খোকন বোঝাতে চাইছে কি না।
খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’।
এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর আদালতে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এরপর তিনি এবং বেঞ্চের অন্য বিচারকরা এজলাস ছেড়ে উঠে যান।
এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সেদিন বলেছিলেন, আদেশ দেওয়ার সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ তখন তার পাশে বসেছিলেন এবং বারবার বলছিলেন, “খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি খোকন বৃহস্পতিবার বলেন, প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের কথা তুলে ধরা নিজের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের, এসব বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো কাজ নেই।
“হু ইজ হি হিয়ার? সে কে? তার বক্তব্যই ইরেলেভেন্ট। তার বক্তব্যটা অনভিপ্রেত, আনবিকামিং। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলাম, উনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি ছিলেন না?
“উনি কীভাবে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন! আই এম শকড অ্যান্ড সারপ্রাইজড।”
প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনা নিয়ে বুধবার জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে।
ওই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বর্ণনা করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগে এমন ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ঘটনাটি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে কোনো অঙ্গের সঙ্গে ঘটেনি। এটি একজন আইনজীবীর আচরণের বিষয়। তবে ওই আচরণকে তিনি সমর্থন করছেন না। সূত্র- বিডি নিউজ।

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া: বেকায়দায় নতুন সরকার

0

 

বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারকে চরম বিড়ম্বনায়  ফেলেছে। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা সাধারণের ধারণার বাইরে।
অভিজ্ঞরা মনে করছেন আন্তবর্তী কালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস ও তার জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুল কবিরের ভুলই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
বিগত ১৫ বছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে জ্বালানি খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের গৃহীত একাধিক বিতর্কিত ও স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ খাত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।বাতিলকৃত প্রকল্প ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ (দায়মুক্তি আইন)-এর অধ্যাদেশ বাতিল করার ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে পূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল রেখে কেবল পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়।
৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে নীতিগত দ্বৈততার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও ‘সভরেন গ্যারান্টি’ বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা না থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো আগ্রহ দেখায়নি। মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য আবেদন জমা পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।
​বকেয়া ঋণের বিশাল বোঝা: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের মেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ না করে বাকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ের নীতি অনুসরণ করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোরই পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় নতুন সরকার চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। কয়লা ও গ্যাসের বকেয়া না মেটানোর কারণে বর্তমানে একাধিক প্রধান কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
​বিতর্কিত এলএনজি চুক্তি ও রামপাল প্রকল্প
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে অন্ধকারে রেখে এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সম্পাদিত এই চুক্তিকে বিশেষজ্ঞরা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল বা পুনর্বিবেচনার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার।
বিদ্যুৎ খাত এখন ‘আইসিইউতে’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মন্তব্য করেন, “পূর্বের সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাত নড়বড়ে অবস্থায় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনা এটিকে মূলত আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।” তিনি জানান, সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পুনর্বহালের উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়।
​বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বকেয়া বিল জমিয়ে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ফলেই আজকের এই চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এটি বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে জনরোষের মুখোমুখি করার জন্য কোনো পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ড. ইউনূসকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হবে: হাইকোর্ট

0

 

পাঁচ করবর্ষের বিপরীতে ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর প্রদেয় সংক্রান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবির বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে জারি করা রুলও খারিজ (ডিসচার্জ) করে দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ফিদা এম কামাল।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুস সামাদ আজাদ।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট একই বেঞ্চ এ বিষয়ে রিট খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন।
পরে ওই রায় প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। কারণ হিসেবে বলা হয়, বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এ কারণে রায়টি প্রত্যাহার করে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর মামলাগুলো শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়।
গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর বাবদ প্রদেয় অর্থের দাবি জানানো হয়। এ দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে পৃথক রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
২০২৪ সালে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল, পাঁচটি করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর বাবদ ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

দায়মুক্তি আইনের আড়ালে হরিলুট: বিদ্যুৎ খাতের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি

0

​

সারাদেশে তীব্র ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ে দিশেহারা জনজীবন। দেশজুড়ে বাড়ছে ক্ষোভ আর অসন্তোষ। কিন্তু এই অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনে বর্তমান সরকারের দায় কতটুকু? গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সংকটের মূল বীজ রোপণ করা হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে। তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত ‘পাঁচ লুটেরা’ বা ‘পঞ্চ পান্ডব’ জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
​মেগাওয়াটের গাণিতিক মায়াজাল ও বাস্তবতার ঘাটতি: ​কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯,০০০ মেগাওয়াট। যেখানে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহেও সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ১৮,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। সাধারণ হিসাবে দেশে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২,০০০ থেকে ১৪,০০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াটের বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিরও বেশি কেন্দ্র হয় পুরোপুরি বন্ধ, না হয় তাদের ক্ষমতার চেয়ে অনেক কমে চলছে। ক্যাপাসিটি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন করতে না পারাটাই বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
গ্যাস ও কয়লা সংকটে নিভেছে উৎপাদন আলো: ​দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসভিত্তিক, যা পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। গত পাঁচ বছরে দেশীয় গ্যাস কূপ খননে বিনিয়োগ না করে লাভজনক ‘ইমপোর্ট সিন্ডিকেট’ রক্ষায় জোর দেওয়া হয়েছিল এলএনজি আমাদানির ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও ডলার সংকটে বিদ্যুৎ খাত ধসে পড়ে। অন্যদিকে, পায়রা ও রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো এবং বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় পর্যাপ্ত জ্বালানি কিনতে পারছে না। শুধু বেসরকারি কেন্দ্রগুলোরই সরকারের কাছে ১৬,৫০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আটকে আছে।
লুণ্ঠনের হাতিয়ার: কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ। ​এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় আইনি ফাঁদ ছিল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। কেন্দ্র বসিয়ে রাখলেও বিদ্যুৎ প্রস্তুত রাখার অজুহাতে সরকারকে মোটা অংকের অর্থ প্রদান বাধ্যবাধকতা করা হয়। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহীর পরিকল্পনায় আপদকালীন সমাধানের নামে বেসরকারি খাতের পথ খোলে। এরপর বিদ্যুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ ‘কুইক রেন্টাল’ প্রথা এবং বিচার বন্ধে ‘দায়মুক্তি আইন’ (ইনডেমনিটি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করেন। এর মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে লাইসেন্স তুলে দিয়ে দুর্নীতির অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়।
বিপুর পারিবারিক সাম্রাজ্য ও ১ লাখ কোটির হরিলুট : ​বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ১০ বছরে এই খাতকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি লুণ্ঠন করেছেন তিনি। তাঁর ভাই, স্ত্রী, ছেলে ও মামাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে আড়াই হাজার কোটি টাকার এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প ১০০ ডলার মূলধনের ‘পাওয়ারকো’ নামের এক কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার অপচেষ্টা  করেছিলেন। যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর মামা কামরুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘হামিদ গ্রুপ’। পরবর্তীতে কোনো দরপত্র ছাড়াই ভিটল, মারুবেনি ও পাওয়ারকো কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলারের কাজ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
প্রিপেইড মিটার ও সোলার প্রকল্পের মেগা দুর্নীতি: ​বিপুর ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু এবং সাবেক সেতুমন্ত্রীর ভাতিজা মিলে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট ডিপিডিসি, নেসকো ও আরইবি থেকে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার প্রি-পেইড মিটারিং ও আইটি প্রকল্প হাতিয়ে নেয়। এছাড়া গত দুই বছরে অনুমোদন পাওয়া ২৭টি সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দুটি পেয়েছেন বিপু’র ভাই অপু। একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে অন্তত ২০টি ধাপে তৎকালীন সিন্ডিকেটকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
<span;>​১৬ দেশে বিপুর সম্পদের সাম্রাজ্য: ​লুণ্ঠিত টাকা দেশে না রেখে ‘ডলার’ ও ‘ইউরো’র মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো। দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মাল্টা, মালয়েশিয়া ও ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে বিপুর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ৪২ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি ও মোবাইল গ্যাস স্টেশন, দুবাইয়ে স্ত্রীর নামে ৩টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ছেলের নামে তালহা পাম বিচে বাংলো, মাল্টায় ক্যাসিনো এবং মালয়েশিয়ায় ৮৫০ কোটি টাকার রাবার ফ্যাক্টরির শেয়ার রয়েছে তাঁর পরিবারের নামে।
শেষ খলনায়ক ও অশুভ চক্রের সমাপ্তি
​বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দিতে ভূমিকা রাখেন সাবেক বিদ্যুৎ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মগুলো ত্বরান্বিত করেন।
বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে কোনো টেকসই ও পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি; হয়েছে সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন। তৎকালীন সরকারের এই নীতিহীন পলিসি ও ‘পঞ্চ পান্ডবে’র পকেট ভরানোর খেসারত হিসেবেই আজকে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে বিষময় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে।

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সংকট: রাজনৈতিক সমাধানের পথ কোথায়?

0

 

 

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, তাঁদের প্রদেশের জন্য বহিরাগত শত্রুর চেয়ে ‘প্রতিবেশী প্রদেশ’ থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি অনেক বেশি। এই বক্তব্য তৈরি করেছে চরম বিতর্ক। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার মতো অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ সেখানকার জনগণ বছরের পর বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় শিকার। পরবর্তীতে পাঞ্জাব সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই গেয়ে বলা হয়, মুখ্যমন্ত্রী নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলকে নয়, বরং এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে জঙ্গিদের অবাধ চলাচলের বিষয়টি বুঝিয়েছেন।
তবে মূল প্রশ্নটি সীমান্ত অতিক্রমের চেয়েও অনেক গভীর। প্রশ্ন হলো—পাকিস্তানে এসব চরমপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর জন্ম ও বিকাশ ঘটল কীভাবে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানের এই নিরাপত্তা সংকটের শিকড় তাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয় নীতির ভেতরেই প্রোথিত। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধার্থে ব্যবহার করেছে। আবার কিছু গোষ্ঠীকে দমন করার নীতি গ্রহণ করেছে। লস্কর-ই-তাইয়েবা বা জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠনগুলো হঠাৎ কোনো প্রদেশের সীমানা থেকে গজে ওঠেনি। রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়েই এরা নিজেদের শক্তিশালী করেছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে সশস্ত্র চরমপন্থীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই দ্বিচারিতা আজ পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কেবল সামরিক শক্তি ও বৈষম্যমূলক নীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংকট মেটানো যায় না। ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ওপর যে বৈষম্য ও সামরিক বলপ্রয়োগ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত দেশের বিভাজন ডেকে এনেছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে—রাজনৈতিক অধিকার, আস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে কোনো রাষ্ট্রকে কেবল অস্ত্রের মুখে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়।

তাই পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সমস্যার জন্য প্রতিবেশী প্রদেশ বা স্থানীয় জনগণকে দায়ী করার সুযোগ নেই। এই সংকট দূর করতে হলে পাকিস্তানকে অতীত নীতি ও ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আত্মসমালোচনা করতেই হবে।