ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 150

ডিএমপির কোতোয়ালি থানার ওসিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা

0

চাঁদা দাবির অভিযোগে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পাঁচজনের বিরুদ্ধে রহিম নামের এক ব্যক্তি মামলা করেছেন। গত ১৭ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে তিনি এই মামলা করেন। মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ মামলাটি তদন্ত করার জন্য ঢাকার মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
মামলার অন্য চার আসামি হলেন কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুল ইসলাম, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) খায়রুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম এবং পুলিশের কথিত সোর্স দেলোয়ার হোসেন।
মামলার কাগজপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মামলায় বাদী মো. রহিম দাবি করেন, পেশায় তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। গত ১২ অক্টোবর তিনি কেরানীগঞ্জ থেকে বাসায় ফিরছিলেন। রাত ৮টার সময় কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া সেতুর ওপর থেকে তাঁকে তিনজন নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে কোতোয়ালি থানাধীন বাবুবাজার সেতুর কাছে নিয়ে আসেন। তখন কোতোয়ালি থানার এসআই আনিসুল ইসলামসহ অন্যরা রহিমের কাছ থেকে ইয়াবা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন। তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কাছ থেকে পুলিশ এক ভরি সোনা, ৬৩ হাজার টাকা নেয়।
মামলায় রহিম দাবি করেন, ১০টি ইয়াবা বড়ি জব্দ দেখিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ১৭ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি গত ৩০ অক্টোবর জামিন পান। সূত্র প্রথম আলো।

শিশুপুত্র সামিউল হত্যা: মা এশা ও প্রেমিক বাক্কুর মৃত্যুদণ্ড

0

এক দশক আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ে পাঁচ বছরের শিশু খন্দকার সামিউল আজিম ওয়াফিকে হত্যার ঘটনায় তার মা আয়েশা হুমায়রা ওরফে এশা ও তার প্রেমিক শামসুজ্জামান বাক্কুর ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত।
ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম রোববার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
দুই আসামি আয়েশা হুমায়রা এশা এবং শামসুজ্জামান বাক্কু জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছেন। আর মামলার বাদী সামিউলের বাবা কে আর আজম বিচার চলার মধ্যেই মারা গেছেন।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দুই আসামির প্রত্যেককে একটি ধারায় পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন বিচারক। আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করে পুলিশ মহাপরিদর্শক, ঢাকার পুলিশ কমিশনার, চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার, গাজীপুরের পুলিশ সুপার এবং পাবনার পুলিশ সুপারকে তার কপি পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “এশা ও বাক্কু তিন বছর ধরে বিবাহ বহিভূর্ত সম্পর্ক চালিয়ে আসছিলেন। সামিউল ছিল এশার একমাত্র সন্তান। সে তার মায়ের ওই সম্পর্কের বিষয়ে জানত, সে কারণে এশা তার সন্তানের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বাক্কুকে প্রলুব্ধ করে। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সামিউলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
“মামলার ভিকটিম একজন নির্দোষ শিশু হওয়ার পরেও হত্যার হাত থেকে কোনো অনুকম্পা বা ক্ষমা পায়নি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিৎ।”
সামিউলের বাবা কে আর আজমের বন্ধু ও ব্যক্তিগত আইনজীবী ইসলাম উদ্দিন বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর ফারুক উজ্জামান ভূঁইয়া এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে সামিউলের পরিবারের কেউ রায়ের সময় আদালতে ছিলেন না; ছিলেন না পলতকদের আইনজীবীরাও।
নবোদয় হাউজিংয়ের গ্রিনউড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্লে গ্রুপের ছাত্র ছিল সামিউল। মায়ের ‘পরকীয়া’র জেরে ২০১০ সালের ২৩ জুন রাতে আদাবরে নিজেদের বাসায় সে খুন হয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, বাক্কু ও এশার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ দেখে ফেলায় সামিউলকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ বস্তায় ভরে ফেলে রাখা হয় আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ে সামিউলদের বাসার পাশে।
লাশ উদ্ধারের পর সামিউলের মা এশা এবং তার প্রেমিক বাক্কুকে আসামি করে আদাবর থানায় হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা করেন সামিউলের বাবা কে আর আজম।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই আসামিই আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
২০১১ সালের  ২৫ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার ওসি কাজী শাহান হক এ মামলায় বাক্কু ও এশার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
পরের বছর ১ ফেব্রুয়ারি ওই দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। এর সাত দিনের মাথায় আদালতে বাদী আজমের জবানবন্দি ও জেরা গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার  সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
এদিকে ২০১৪ সালে মামলার বাদী কে আর আজম থানায় একটি জিডি করেন। সেখানে বলা হয়, হাই কোর্ট থেকে জামিনে বেরিয়ে বাক্কু তাকে হুমকি দিচ্ছেন, মামলা চালানো বন্ধ না করলে ‘ছেলের মতো তাকেও মেরে ফেলা হবে’।
ওই বছরই আদালতে আবেদন করে স্ত্রীর জামিন করিয়েছিলেন আজম, পরে কিছুদিন স্ত্রীর সঙ্গে ঘরও করেছিলেন তিনি।
কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত আজম মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই মারা যান। মৃত্যুর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
এ মামলার বিচার চলাকালে মোট ২২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। গত ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।

মামলাজট কমাতে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তিতে জোর দেয়ার তাগিদ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের

0

বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৯০ ভাগ মামলা স্বাভাবিক আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হয়। মামলাজট কমাতে বাংলাদেশকে সেদিকেই যেতে হবে। এ জন্যই সরকার বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি চালু করেছে। বিচারপ্রার্থী জনগণসহ আইনজীবীদের এ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে।
রোববার ঢাকায় বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে জিপি (জেনারেল প্রসিকিউটর ) এবং পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর)দের জন্য অনলাইনে আয়োজিত ২২তম বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
মীমাংসাযোগ্য মামলাগুলো আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলে গেছেন যদি কোনো দেওয়ানী মামলা দাদা শুরু করেন তাহলে তা বাবা চালায়, ছেলে চালায়, নাতি চালায় তাও শেষ হয়না। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমরা আর এর মধ্যে থাকতে চাই না। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের বিষয়টি সরকারি আইন কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আদালত অঙ্গনে দুর্নীতি সংক্রান্ত সকল প্রচলিত প্রথা পরিহার করে সততা, স্বচ্ছতা, সাহসিকতা এবং গাতিশীলতার সমন্বয় ঘটিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজ নিজ কর্মস্থলে উন্নত নৈতিকমান ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে আন্তরিকতার সাথে সরকারি মামলা পরিচালনা করতে হবে। বিচারপ্রার্থী জনগণ যাতে তাদের নিকট সবরকম সহোযোগিতা পায় সে বিষয়েও সজাগ থাকতে বলেন আইনমন্ত্রী।
আইন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী আরও বলেন, সকল প্রকার দুর্নীতি হতে দূরে থেকে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার প্রতিটি পর্যায়ে সততা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই জনগণের প্রত্যাশিত স্বল্পসময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, আপনারা স্ব স্ব জেলার সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই উপলব্ধি করেছি যে, আপনাদের বেতন বা ফি বাড়ানো দরকার। আপনাদের একটি সম্মানজনক এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার মতো ফি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
মন্ত্রী বলেন, আজকে আমাদের এই ভার্চুয়াল সিস্টেম না থাকলে কিন্তু জীবনযাত্রা পথ বন্ধ হয়ে যেত। আমরা দেখেছি যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ভার্চুয়াল অ্যাক্ট না করতে পেরেছি ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আদালত ও বিচার কাজ বন্ধ ছিল, আইনজীবীদের কাজও বন্ধ ছিল। ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হওয়ার পরে ৭২ হাজার লিটিগ্যান্ট পাবলিককে রিলিফ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এটা আমাদের একটা গর্বের বিষয়। ভার্চুয়াল কোর্ট করার এই পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে।
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি খোন্দকার মূসা খালেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন সচিব মো. গোলাম সারওয়ার এবং ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. গোলাম কিবরিয়া বক্তৃতা করেন।

সিগারেটের দাম ও করকাঠামোর আন্তর্জাতিক সেরা মানদণ্ডের চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ

0

বাংলাদেশসহ ১৭০টিরও বেশি দেশের সিগারেট করনীতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রথমবারের মত ইন্টারন্যাশনাল সিগারেট ট্যাক্স স্কোরকার্ড প্রকাশ করেছে টোব্যাকোনমিকস। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস শিকাগো (ইউআইএস) এর হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের অধীনে টোব্যাকোনমিকস মূলত অর্থনৈতিক গবেষণা করে থাকে।
গবেষণায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর ২.৩৮ (৫ এর মধ্যে), যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (২.০৭) চেয়ে সামান্য বেশি। তবে সিগারেটে করারোপের ক্ষেত্রে যেসব দেশ খুব ভালো স্কোর (৪.৬৩) করেছে তাদের তুলনায় বাংলাদেশের এখনও অনেক উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া দুটি দেশ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। দেশদুটিতে সিগারেটের উপর উচ্চহারে সুনির্দিষ্ট একক এক্সাইজ কর চালু থাকায় এবং নিয়মিতভাবে তা বৃদ্ধি করায় সিগারেটের সহজলভ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
টোব্যাকোনমিকস স্কোরকার্ড বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের তথ্য ব্যবহার করে দেশগুলির সিগারেট কর নীতিমালা মূল্যায়ন করেছে। প্রায় অর্ধেক দেশ দুইয়ের নিচে স্কোর পেয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে খুব সামান্যেই, বৈশ্বিক গড় স্কোর ১.৮৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.০৭।
টোব্যাকোনমিকস এর পরিচালক এবং এই স্কোরকার্ডের প্রধান লেখক ফ্রাঙ্ক জে. চালুপকা বলেন, “এই স্কোরকার্ডের মাধ্যমে এটি পরিস্কার যে, সিগারেটের কর বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে যা কোভিড-১৯ ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় ব্যবহার করা সম্ভব এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এরফলে অকাল মৃত্যু রোধ হবে এবং যা একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গঠনে অবদান রাখবে।”
সিগারেট করনীতির স্কোর এ ২০১৪ সালের (০.৮৭৫) তুলনায় ২০১৮ সালে (২.৩৮) বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতি হলেও সিগারেটের দাম ও করকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। উভয় ক্ষেত্রেই মাত্র ১ স্কোর পেয়েছে বাংলাদেশ। বহুস্তরবিশিষ্ট অ্যাডভেলোরেম করকাঠামো এবং ভিত্তিমূল্য খুব কম থাকাই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
জাতীয় তামাকবিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, “সিগারেটের বিদ্যমান জটিল মূল্যস্তর প্রথা বাংলাদেশের স্কোর কম পাওয়ার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে সিগারেটে করারোপের ক্ষেত্রে বহুস্তর বিশিষ্ট মূল্যস্তর প্রথা বিলুপ্ত, সুনির্দিষ্ট করপদ্ধতি প্রবর্তন এবং সর্বোপরি জীবন বাঁচাতে, ক্যানসারসহ তামাকজনিত রোগের প্রকোপ কমাতে ও প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণের জন্য সমস্ত তামাকজাত পণ্যের উপর বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক উল্লেখযোগ্যহারে বাড়াতে হবে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে তামাকাসক্ত ফুসফুস করোনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে এবং প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজ বাড়িতেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তামাকের ক্ষতির শিকার এই বিপুল প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠী বর্তমানে মারাত্মকভাবে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সস্তা তামাকপণ্যই এর প্রধান কারণ। তামাকজাত পণ্যের কর বৃদ্ধি করা হলে এর ব্যবহার কমে এবং সরকারের বাড়তি রাজস্ব আয় অর্জন সম্ভব হয়। অতিরিক্ত এই অর্থ সরকার করোনা মহামারি সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যয় এবং প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যয় করতে পারবে।”
বাংলাদেশে বছরে ১ লক্ষ ২৬ হাজার মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে অকাল মৃত্যুবরণ করে এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা উক্ত বছরের জিডিপির ১.৪ শতাংশ। উপরন্তু, কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সুনিশ্চিতভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে এই অার্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের জন্য একটি দ্রুত এবং সহজ উপায় হবে তামাক কর সংস্কার করা। তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য ক্ষতি হ্রাস করার একমাত্র কার্যকর উপায় তামাক কর এবং এক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ একক সুনির্দিষ্ট এক্সাইজ কর আরোপ এবং মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে নিয়মিত কর বৃদ্ধি করা।

আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষায় প্রশ্ন কঠিন হয়েছে দাবি করে ‘হট্টগোল-ভাঙচুর’

0

হট্টগোল, ভাঙচুর এবং বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘আইনজীবী অন্তর্ভুক্তি’ পরীক্ষা।
করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এক দফা পিছিয়ে শনিবার ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত এ পরীক্ষা হয়।
তবে কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা হয়নি আবার কোনো কেন্দ্রে সময় বাড়িয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।  
আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, সূত্রাপুরে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, টিকাটুলীর সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজ, বিসিএসআইআর হাই স্কুল ও লক্ষ্মীবাজারের ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ১৩ হাজার জন।
সকালে শুরুর পরপরই ‘প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছে’ এমন অভিযোগ তুলে মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকার কয়েকটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে।
কোনো কোনো কেন্দ্রে হট্টগোল, ভাঙচুরের কারণে পরীক্ষাই হয়নি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।
তবে কেন্দ্রে হট্টগোল, পরীক্ষা বর্জন বা পরীক্ষা না দিতে বাধ্য করানোর ব্যপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বার কাউন্সিলের সচিব রফিকুল ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শুনেছি মোহাম্মদপুরের একটি কেন্দ্রে হট্টগোল হয়েছে। এর বেশি কিছু আপাতত বলতে পারব না।”
পদাধিকার বলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, “যারা পরীক্ষা দিতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি তাদের ব্যাপারে পরে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারলে আমরা ব্যবস্থা নেব। যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তারা কি বাধ্য হয়ে দিতে পারেনি, নাকি ইচ্ছা করে দেয়নি, তা বুঝেশুনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
“এর বেশি এখন তো কিছু করতে পারব না। তাছাড়া আমি একা তো কিছু করতে পারব না, সবার সাথে বসতে হবে। চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতে হবে। উনি তো এখন নিজেও পারবেন না। আমাদের পাঁচজনের কমিটি। এই পাঁচজন মিলে বসে সিদ্ধান্ত নেব।”
লক্ষ্মীবাজারের ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, “সব এলোমলো হয়ে গছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ৫ মিনিটের মাথায় পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রের গেট ভেঙে প্রশ্ন, খাতা নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যায়। পুলিশ তখন একেবারেই নীরব ছিল। আধাঘণ্টার উপরে এভাবে ছিল।
“পরে টিমসহ ম্যাজিস্ট্রেট আসলে কিছু পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে ঢোকে। আমি কেন্দ্রের ভেতরেই ভাঙা টেবিলে বসে ছিলাম। কিন্তু ভেতরে তখন শিক্ষকরা ছাড়া কেউ ছিল না। পরবর্তীতে আমিসহ কিছু পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিই। এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত  পরীক্ষা হয়।”
এই পরীক্ষার্থীর অভিযেগি, পরীক্ষা দিতেই এসেছিল সবাই। কিন্তু অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন এবং বার কাউন্সিলের ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রশ্নবিদ্ধ প্রশ্ন হয়েছে। মানদণ্ড বজায় রেখে এ প্রশ্নপত্র করা হয়নি।
একই অভিযোগ করেন সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী জাকের হোসেন।
তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যবিধি মেনেই নির্ধারিত সময়ের আগে কেন্দ্রে ঢুকি। প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর পরই পরীক্ষার্থীরা হইচই শুরু করে। প্রশ্নটা একেবারেই ব্যতিক্রম হয়েছে। গতানুগতিক যে প্রশ্ন করে আসছে বার কাউন্সিল, সেরকম প্রশ্ন এবার হয়নি।
“এক পর্যায়ে কিছু শিক্ষার্থী এসে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পরীক্ষার্থীদের খাতা কেড়ে নিতে শুরু করে। দরজা-জানালা ভাঙচুর শুরু করে তারা। তারা প্রশ্নপত্র, খাতা মাঠে ফেলে দেয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছায়ও ফেলে দিয়েছে। সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে এ পরিস্থিতি। সেসময় ম্যাজিস্ট্রেট, পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একটা রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন।”
জাকের বলেন, “বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রক ঘোষণা দেন পরীক্ষা হবে না। বাসায় চলে যেতে বলেন পরীক্ষার্থীদের। ঘোষণা দেওয়ার পরও যখন কিছু পরীক্ষার্থী বের হচ্ছিল না, তাদের পুলিশ এসে পিটিয়ে বের করে দেয়। সাড়ে ১১টার মধ্যে গোটা কেন্দ্র খালি করে ফেলা হয়। এরপর আর পরীক্ষাই হয়নি।” 
বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় নৈরাজ্য নিয়ে নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল।
চারটি ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষায় নজিরবিহীন নৈরাজ্যের কারণে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এই অরাজকতায় আমি ব্যথিত ও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
“এ প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জনাব এ এম আমিন উদ্দিন, বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি জনাব মো. নুরুজ্জামান, ভাইস-চেয়ারম্যান জনাব ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, বার কাউন্সিল সদস্য জনাব এ জে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কথা বলেছি। কোন প্রকৃত পরীক্ষার্থী যেন কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সে বিষয়ে তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিবেন সেই অনুরোধ রেখেছি। শিক্ষার্থীরা হতাশ হবেন না। আমার একান্ত বিশ্বাস, বার কাউন্সিল কতৃপক্ষ আপনাদের পক্ষেই থাকবেন।”
গত ২৬ সেপ্টেম্বর এ পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। তার আগেই গত ২০ সেপ্টেম্বর নোটিস দিয়ে বার কাউন্সিল জানায়, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সে নোটিসেই ১৯ ডিসেম্বর পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করে বার কাউন্সিল। 
এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার নিয়ে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরীক্ষার্থীরা। তারা বিভিন্ন দপ্তরে এ দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু ঘোষিত তারিখে পরীক্ষা নিতে অনড় থাকে বার কাউন্সিল।  বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে অর্থাৎ আইনজীবী সনদ পেতে নৈর্ব্যক্তিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
ওই তিন ধাপের যেকোনো একটি পরীক্ষায় কেউ একবার উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী পরীক্ষায় তারা দ্বিতীয়বার মত অংশগ্রহণের সুযোগ পান। দ্বিতীয়বারও অনুত্তীর্ণ হলে তাদের পুনরায় শুরু থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
২০১৭ সালের ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে লিখিত পরীক্ষায় দ্বিতীয়বারের মত মত বাদ পড়া তিন হাজার ৫৯০ জন এবং ২০২০ সালে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৮ হাজার ৭৬৪ জনসহ মোট ১২ হাজার ৩৫৪ জন সনদপ্রত্যাশী পরীক্ষার্থী এই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন।

বঙ্গবন্ধু ও সুপ্রিম কোর্ট

0

১৮ ডিসেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট দিবস’। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞার সভাপতিত্বে উভয় বিভাগের বিচারপতিদের ফুল কোর্ট সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী যেহেতু ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল, সেহেতু প্রতিবছর ওই দিনটিকে বাংলাদেশ ‘সুপ্রিম কোর্ট দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। সেই থেকে ১৮ ডিসেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। 

১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ছিল সরকারি ছুটি। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওই দিন ছুটি প্রত্যাহার করে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের ‘দৈনিক কার্য তালিকা’ (কজ লিস্ট) প্রণয়ন করেন এবং ওই তারিখ থেকে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম শুরু হয়।

উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসার পরদিন অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি ‘দি প্রভিশনাল কন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২’ জারি করা হয়। ওই আদেশের অনুচ্ছেদ ৯-এ উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে একটি হাইকোর্ট থাকবে- যা একজন প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতি যারা সময়ে সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন তাদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ওইদিনেই রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে বাংলাদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান। ১৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ৫নং আদেশ অর্থাৎ ‘দি হাইকোর্ট অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২’ জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ হাইকোর্ট।  স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের গোড়াপত্তন এভাবেই। 

রাষ্ট্রপতির ১১৪ নং আদেশ অর্থাৎ ‘দি হাইকোর্ট অব বাংলাদেশ’ (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট) আদেশ দ্বারা রাষ্ট্রপতির ৫নং আদেশের কার্যকারিতা দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি হতে। বাহাত্তর সালের ১৬ অগাস্ট বাংলাদেশ হাইকোর্ট-এর আপিল বিভাগ গঠন এবং এর কার্যক্রম শুরু হয়। 

১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে। ভাষণ দিয়েছিলেন সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, আইনজীবীসহ উপস্থিত সুধীবৃন্দের উদ্দেশে। 

বক্তব্যের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন ও আত্মত্যাগকারী আইনজীবীসহ সকলের প্রতি। তিনি বলেছিলেন,

যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমাদের সুপ্রিমকোর্ট, আজ আমাদের দেশে আইনের শাসন হতে চলেছে, তাদের আমাদের স্মরণ করা প্রয়োজন। 

বঙ্গবন্ধু সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে শহীদ আইনজীবীদের নামফলক দেখতে না পেয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,

আমি নিশ্চয়ই সুখি হতাম, যেমন পিজি হসপিটালে গিয়ে দেখি যে, এতজন ডাক্তারের নাম, যারা শহীদ হয়েছে, তাদের নাম লেখে ফলক করে রাখা হয়েছে। আমি সুখি হতাম বারের সদস্য ভাইয়েরা, যে যে সহকর্মীরা যারা শহীদ হয়েছেন- এই সুপ্রিম কোর্টের গেইটে এসে দেখতে পেতাম যে শহীদের নাম সেখানে লেখা রয়েছে। বেয়াদবী মাফ করবেন, আপনাদের আমি অভিযোগ করছি না। 

বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন-

আইনের শাসনে আমরা বিশ্বাস করি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই অনেক আমরা সংগ্রাম করেছি এবং এই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক মানুষের রক্ত দিতে হয়েছে। বাংলাদেশে আইনের শাসনই প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্যই শাসনতন্ত্র এত তাড়াতাড়ি দিয়েছিলাম। যদি ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা, যদি রাজনীতি করতাম আপনারা নিশ্চয়ই আমার পাশে যারা বসে আছেন জানেন যে, তালে তাল মিলিয়ে- গালে গাল মিলিয়ে বহুকাল ক্ষমতায় থাকতে পারতাম। কিন্তু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি নাই, রাজনীতি করেছিলাম মানুষের মুক্তির জন্য। সে মানুষের মুক্তি মিথ্যা হয়ে যাবে, যদি মানুষ তার শাসনতন্ত্র না পায়। আইনের শাসন না পায়।

… আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। আপনারা আইনের শাসন পরিচালনা করবেন।

সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন,

আইনের মধ্যে যদি গোলমাল হয়, সেখানে আপনাদের সংশোধন করার ক্ষমতা রয়েছে। মনে করেন তাতে পরিপূর্ণতা হচ্ছে না- আপনাদের ক্ষমতা রয়েছে নতুন আইন পাশ করা। এমন আইন পাশ করা উচিত হবে না দেশের মধ্যে রেষারেষি সৃষ্টি হয়।

সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর মধ্য থেকেই যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত ও শাসনতন্ত্র প্রয়োগ করতে হবে বঙ্গবন্ধু সে বিষয় সংশ্লিষ্ট সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন-

সেজন্য আইনের শাসন করতে হলে, আমাদের শাসনতন্ত্রের মধ্যে যে মৌলিক জিনিস রয়েছে সেটাকে মেনে নিয়েই করতে হবে বলেই বিশ্বাস করি। আমি আইনজীবী নই, আপনারা আইনজীবী, আপনারা বুদ্ধিজীবী, আপনারা ভালো বুঝেন। আমি আইনজীবী কোন দিন হতে পারি নাই, তবে আসামী হওয়ার সৌভাগ্য আমার যথেষ্ট হয়েছে জীবনে। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে দেশের শাসনতন্ত্রকে যাতে উপযুক্ত ব্যবহার করা হয়, সেদিকে আপনারা নজর রাখবেন। কারণ সে ক্ষমতা শাসনতন্ত্রে আপনাদের দেওয়া হয়েছে। যে আইন শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে হবে তার সম্পর্কে মতামত দেওয়ার অধিকার আপনাদের আছে, নাকচ করার অধিকার আপনাদের রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে যায়। সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমি আপনাদের অ্যাডভাইজ দিতে চাইনা, আপনারা এ জিনিসটা আমার চেয়ে অনেক ভাল বুঝেন।

… আইনের শাসন এদেশে হবে এবং আমাদের শাসনতন্ত্র যে হয়েছে, আমরা চেষ্টা করব সকলে মিলে চেষ্টা করব যাতে এটার যে আদর্শ দেওয়া হয়েছে আদর্শকে রক্ষা করা এবং এখানে সুপ্রিম কোর্টের অনেক দায়িত্ব রয়েছে এবং আপনাদের যে সাহায্য  সহযোগিতা প্রয়োজন, আপনারা সেটা পাবেন।

বঙ্গবন্ধু বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আপনাদের কোন কাজে আমরা ইন্টারফেয়ার করতে চাইনা। আমরা চাই যে, দেশের আইনের শাসন কায়েম হউক।”

পাশাপাশি তিনি বিচার বিভাগকে দেশের মানুষের মানসিকতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন,

তবে একটা কথা আছে, দেশের অবস্থা আপনাদের বিবেচনা করে চলা উচিত। অনেক সময় যদি বেশি আপনারা করতে যান তবে দেশের মধ্যে যদি আইন-শৃংখলার খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তবে যেমন আমিও কষ্ট ভোগ করব, আপনিও কষ্ট ভোগ করবেন, সেদিকে আপনাদের খেয়াল রাখারও প্রয়োজন আছে। . . . দেশের মানসিকতা, দেশের আবহাওয়া বিবেচনা করেও চলতে হবে। তা না হলে শুধু আইন করে চলেনা কোন কিছুই।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

স্বাধীন দেশের প্রত্যেকটি অর্গানের সাথে অন্যান্য অর্গান অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একটা বাদ দিয়ে আরেকটা চলতে পারে না, চললেও কষ্ট হয়। সেজন্য যখন বলেন- কমপ্লিট ইন্ডিপেন্ডেট, সেখানে আমি বলি না- ইন্ডিপেডেন্ট। কারণ রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই এবং শাসনতন্ত্রের ভেদ কাঠামোর মধ্যেই আমাদের সবকিছুতেই চলতে হবে। এরজন্যই আমাদের যার যা কর্তব্য আমাদের পালন করতে হবে।

সংবিধানের স্কিম সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

দুনিয়ার কোন শাসনতন্ত্রেই খারাপ কথা লেখা নাই। কিন্তু সেটা যদি আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে কাজ করে এগিয়ে না যাই তাহলে দেশের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। আমাদের শাসনতন্ত্র আমাদের আদর্শ আছে। যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। যেমন চারটা স্তম্ভের উপরে এই দেশ, আমরা তাকে ‘ফান্ডামেন্টাল রাষ্ট্র আদর্শ’ বলি। চারটা রাষ্ট্রীয় আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই দেশ চলবে। এটাই হইলো মূল কথা। এইটাকে যদি ধ্বংস করতে কেউ না পারে, যেমন এক্সিকিউটিভ, যেমন আইনসভা, তেমনি আপনাদের সুপ্রিম কোর্টেরও অধিকার রয়েছে যাতে এর উপরে কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে। 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

আপনারা যখন বলেন, আমরাও তখন বলেছি এবং আমরা এটা বিশ্বাস করি যে, জুডিশিয়ারি সেপারেট হবে এক্সিকিউটিভ থেকে। অনেকে বলেন, কমপ্লিট সেপারেশন। কোন রাষ্ট্রে কোনকিছুই কমপ্লিট সেপারেশন হয় না। একই সঙ্গে একটা অন্যটার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একই রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে যে অর্গানগুলি থাকে- যেমন জুডিশিয়ারি একটি অরগান, যেমন এক্সিকিউটিভ একটি অরগান, এরমধ্যে যদি কোপারেশন না থাকে, তাহলে সেদেশের মধ্যে কেওয়াজ সৃষ্টি হয়, যে কেওয়াজের ফলে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালের পর থেকে আপনাদের যে দশা হয়েছিল সে দশাই হবে। একটার সঙ্গে অন্যটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু যার যার যেখানে ক্ষমতা রয়েছে সেটাকে নিশ্চয়ই প্রতিপালন করবেন। 

… কেউ কোনদিন হস্তক্ষেপ করবে না আপনাদের অধিকারের উপরে। সে সম্বন্ধে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন এবং যতটা তাড়াতাড়ি হয় আমরা চেষ্টা করব যাতে জুডিশিয়ারি সেপারেটভাবে কাজ করতে পারে।

মাতৃভাষা বাংলায় রায় লেখার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, যে ইংরেজি ভাষায় অনেক কিছু আমাদের চলছে। ইংরেজি ভাষা আমাদের রক্তের মধ্যে কিছু কিছু আচরণ করেছে সন্দেহ নাই এবং ইংরেজি ভাষা আমাদের পরিভাষার প্রয়োজন সেটাও বুঝি, কিন্তু এ পরিভাষার জন্য যদি চিন্তা করি, হয়ত বাংলা ভাষা হবে না। সে জন্যই আমরা শাসনতন্ত্রে কোন ভাষা মিডিয়া রাখি নাই, যে পাঁচ বৎসরে দশ বৎসরের মধ্যে বাংলা থেকে ইংরেজিতে পৌঁছতে হবে। আপনারা চেষ্টা করুন। যেভাবে আপনাদের ভাষা আসে তার মধ্য থেকেই জাজমেন্ট লেখার চেষ্টা করুন। এভাবেই যা শেষ পর্যন্ত ভাষায় পরিণত হয়ে যাবে।

. . . মাননীয় প্রধান বিচারপতি সাহেব, বেয়াদবী মাফ করবেন। এইটা আমাদের, যা আমি দেখেছি, অনেক দেশে ঘুরেছি যারা তাদের অক্ষর পর্যন্ত নাই, তারা নিজের ভাষায় কথা বলে, নিজের ভাষায় লেখে এবং জাজমেন্ট দেয়।

বঙ্গবন্ধু বক্তব্য শেষ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের কাছে এই প্রত্যাশা নিয়ে- “এত বিপদ আপদ, এত অভাব-অনটন, দুঃখ কষ্টের মধ্যে শাসনতন্ত্র দিয়েছি। এত তাড়াতাড়ি এজন্য দিয়েছি যে আইনের শাসনে বিশ্বাস করি এবং সেজন্যে শাসনতন্ত্র দেওয়া হয়েছে। আশা করি, আজ আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আমাদের শাসনতন্ত্র হয়েছে যার জন্য বহু রক্ত গেছে- এ দেশে আজ আমাদের সুপ্রিম কোর্ট হয়েছে। যার কাছে মানুষ বিচার আশা করে।” 
বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। রক্তস্নাত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পাল্টিয়ে দেওয়ার জন্যই জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের সাজা নিশ্চিত করে বিচার বিভাগ বঙ্গবন্ধুর সামান্য ঋণ শোধ করেছে মাত্র। রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রকে অক্ষুন্ন রেখে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দ্রুততার সাথে বিচার প্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর আহ্বান-প্রত্যয় বাস্তবায়ন, তার স্বপ্নসাধ পূরণ ও রক্তঋণ শোধ করার দায়ভার আজ সুপ্রিম কোর্টের উপর।
আইনের শাসন নিয়ে বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে স্বাধীন বিচার বিভাগ বিচারবিভাগ ও বঙ্গবন্ধু সুপ্রিম কোর্ট সুপ্রিম কোর্ট দিবস স্বাধীন বিচার বিভাগ হাই কোর্ট
এম ইনায়েতুর রহিমবিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।

লেখক ঃ এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি, হাইকোর্ট।

সুপ্রিমকোর্ট দিবসের আলোচনায় রাষ্ট্রপতি; রায়ের কপির জন্য যেন ঘুরতে না হয় নজর রাখতে অনুরোধ

0

মামলার রায়ের পর যাতে বিচারপ্রার্থীদের আদালতের বারান্দায় ঘুরতে না হয়, সেদিকে নজর দিতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভিডিও বার্তায় রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন।
নিজের আইন পেশার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি নিজে একজন আইনজীবী হিসেবে জানি বিচার কাজ কত কঠিন ও জটিল। বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় একজন বিচারককে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু তারপরও আমি বলব, মামলার পরিমাণ দিন দিন যে হারে বাড়ছে, সেটাকে আয়ত্তের মধ্যে আনতে হলে বিচারকদের আরো বেশি কাজ করতে হবে।
“সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং বিচারকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু বিচারকদের খেয়াল রাখতে হবে, মামলার রায় হওয়ার পর রায়ের কপি পাওয়ার জন্য বিচারপ্রার্থীদের যেন আদালতের বারান্দায় দিনের পর দিন ঘোরাঘুরি করতে না হয়।”
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের উচ্চ আদালত। সেদিন সরকারি ছুটি ছিল বলে আদালতের প্রথম কার্যক্রম বসে ১৮ ডিসেম্বর।
২০১৭ সালে প্রতি বছরের ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে শুক্রবার সেই অনুষ্ঠানেরই আয়োজন করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সকল কার্যক্রম ডিজিটালি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে আদালত প্রাঙ্গণে শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে বিচারপ্রার্থী জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য আমি এ কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
“বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে অনলাইন কজলিস্ট চালু হয়েছে এবং অনলাইন বেল কনফার্মেশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চলছে। আমি একইভাবে আদালতের সমস্ত কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু ‘কোর্ট অব রেকর্ড’ সেহেতু এর সকল নথি এবং মামলা দায়ের থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সমস্ত কার্যক্রমকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’।
“তাই মনে রাখতে হবে, একজন বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার পাওয়া তার অধিকার। আর নাগরিকের সে অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এখানে দয়া বা অনুকূল্যের কোনো বিষয় নেই। দেশ, জনগণ ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সকলে তাদের মেধা ও মনন প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন, সুপ্রিম কোর্ট দিবসে- এটাই সকলের প্রত্যাশা।”
আবদুল হামিদ বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম হল শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ তৈরি করা।
“উন্নয়নের সাথে ন্যায়বিচার এবং আইন-আদালতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটা কথা মনে রাখতে হবে, বিরোধের মীমাংসা যথাযথভাবে না হলে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হবে। আর এই প্রক্রিয়া বারবার চলতে থাকলে রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
“বিচার ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করে জনগণের ক্ষোভ প্রশমন করে। এতে সমাজে বৈষম্য দূরীভূত হয় এবং রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। আর এভাবেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।”
মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিচাপরপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
প্রধান বিচারপিত সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
এ অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে’ স্মারক গ্রন্থের ডিজিটাল সংস্করণ উন্মোচন করা হয়। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের ওপর একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

সুপ্রিমকোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীন, এখন আর অদৃশ্য হাতে বিচার থামেনা, বললেন আইনমন্ত্রী

0

কোভিড ১৯ এর পিক টাইমে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এ সময় বিচারকগণ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনা করে কঠিন দুঃসময়েও দেশে বিচারকাজ চালু রেখেছেন যা সারা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। এর মাধ্যমে গোটা বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সক্ষমতারও পরিচয় ফুঠে উঠেছে। বিচার বিভাগের আজকের অবস্থানের পিছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানও অনস্বীকার্য। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এসব কথা বলেছেন।
শুক্রবার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দিবস উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ প্রধান অতিথি ছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিগত ৪৮ বছরের পথচলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বহু উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। দেরিতে হলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেলহত্যা মামলার বিচার এবং ১৯৭১-এর মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের অবদান ভুলবার নয়। দেশে বিচারহীনতার যে সংষ্কৃতি তৈরি হয়েছিলো তা থেকে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা জাতি আজীবন স্মরণ রাখবেন। সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায় একদিকে যেমন বন্দুকের নলের মাধ্যমে অবৈধ ও অগণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারীদের বারিত করেছে অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি আজকের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীন কিন্তু এ অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য যে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছিল তা স্মরণ না করলে ভবিষ্যত পথচালয় ভ্রান্তি হতে পারে। স্মরণ রাখতে হবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর দীর্ঘ ২১ বছর একটি মামলা পর্যন্ত রুজু হয়নি। বরঞ্চ এই হত্যাকান্ডের বিচার যাতে না হয় সেজন্য একটি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যাস জারি করা হয়েছিল। জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বহুবার এই কোর্টে এসেছেন। কিন্তু তাঁরক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। তিনি তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে পারেননি। এক অদৃশ্য অপশক্তির ভয়ে তখনকার কোর্টগুলো এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার পাওয়ার জন্য তাঁকে সরকারে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। আবার তিনি ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর সকল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচারিক আদালতে এই হত্যাকাণ্ডে বিচারের রায় হলেও তিনি যখন ক্ষমতা থেকে চলে যান তখন সেই অদৃশ্য অপশক্তির প্রচেষ্টায় হাইকোর্টে আবারও এই মামলার বিচার কাজ থেমে যায়। আজ দৃঢ়ভাবে বলতে পারি সেই অবস্থাকে পিছনে ফেলে আজকের সুপ্রিম কোর্ট একটি সুদৃঢ় অবস্থানে পোঁছেছে।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বক্তৃতা করেন।

বিদেশে অর্থ পাচার: কারও নাম দিতে পারে নি দুদক, হাইকোর্টের অসন্তোষ প্রকাশ

0

কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারকারীদের নাম ঠিকানা ও তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ দেখাতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত দুদকের প্রতিবেদন দেখে হাই কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন দুদকের কৌঁসুলি মো. খুরশীদ আলম খান। 

প্রতিবেদনটি দেখে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “বিদেশে এত লোক টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারা নিয়ে যাচ্ছে, তাদের একজনের নামও পাননি!

“ইউ ওয়ান্ট টু সি দুদক কয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আপনারা অন্ততপক্ষে এটা দেখান যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। টাকা আসবে কি আসবে না, সেটা পরে দেখা যাবে।” বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

গত ১৮ নভেম্বর ডিআরইউর মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের সত্যতা পাওয়ার কথা জানান।

প্রাথমিকভাবে অর্থপাচারে জড়িত যাদের তথ্য পাওয়া গেছে তার মধ্যে সরকারি কর্মচারীই বেশি বলে জানান তিনি। এছাড়া রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ী থাকার কথাও জানান তিনি। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি।

সে বক্তব্যের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাঙালি অধ্যুষিত কানাডার ‘বেগমপাড়া’র প্রসঙ্গ উঠে আসে।

ফাইল ছবি।

সেসব প্রতিবেদন নজরে আসার পর গত ২২ নভেম্বর হাই কোর্ট অর্থ পাচারকারী, দুর্বৃত্তদের নাম-ঠিকানার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানতে চায়।

স্বরাষ্ট্র সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে তা জানাতে বলা হয়।

এছাড়া প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে অর্থপাচারকারী সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, ব্যাংক কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করে।

নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

দুদক ছাড়া বাকি সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তাহমিনা পলি। 

‘নামটাও জানা যাবে না!’
অর্থপাচারের অপরাধে ২০১৬ থেকে চলতি বছর দুদক কতগুলো মামলা করেছে, কতগুলো অভিযোগ তদন্ত করেছে, কত টাকা বিদেশ থেকে ফেরত এনছে, প্রতিবেদনে সেসব ফিরিস্তি তুলে ধরতে গেলে আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খানকে থামিয়ে দিয়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “এগুলো তো আগে করছেন। পুরাতন কাহিনী বলে তো লাভ নাই। ২২ তারিখের পর (২২ নভেম্বর) কী করেছেন?”

তখন খুরশীদ আলম খান ২২ তারিখের পরের সমস্ত তথ্য যোগ করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বললে বিচার বলেন, “কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?”

প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় বিচারক বলেন, “বহু লোকের নাম আমরা দেখেছি। বিভিন্ন মিডিয়ায় আমরা প্রতিবেদন দেখেছি। অনেক লোকের নাম তো আসছে। এগুলোর উপর ভিত্তি করে বা আপনাদের অনুসন্ধানের পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে পারেন কি না?”

জবাবে দুদকের আইনজীবী বলেন, “আমাকে যদি মামলা করতে হয় প্রথমত আমাকে এমএলএআর (মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্ট) করতে হবে।”

বিচারক বলেন, “কানাডা, আমেরিকায়, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারকারীরা আছে। তাদের একজনের নামও আপনি পাননি? ইউ ওয়ান্ট টু সি কয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। যেটার জন্য রুল ইস্যু করলাম কানাডা, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, মালয়েশিয়ায় তারা বিশাল টাকা পাচার করেছে। অন্ততপক্ষে আপনারা সেটা দেখান যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। টাকা আসবে কি আসবে না, সেটা পরে দেখা যাবে।”
আইনজীবী খুরশীদ আলম খান তখন আবার বলেন, “আমরা এমএলআর’র জন্য অপেক্ষা করছি না। অভিযোগ পত্র দিয়ে দিয়েছি। ইসমাইল হোসেন সম্রাটের মামলায়…”

বিচারক থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলছেন। আমরা বলতে চাচ্ছি যারা কানাডায়, মালয়েশিয়ায় তাদের ব্যাপারে কী করছেন, যারা দেশের বাইরে আছে। এই যে নামধাম আমরা শুনছি, বহু টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। টিভিতে আমরা বাড়ি দেখি, পত্রিকায় আমরা বাড়ির ছবি দেখি। কীভাবে তারা এসব করছে? তাদের নামটাও জানা যাবে না? নামটাও জানতে পারব না?”

খুরশীদ আলম খান তখন বলেন, “অবশ্যই অবশ্যই। কেন জানতে পারবেন না। অবশ্যই জানা যাবে। অবশ্যই বিচার হবে মাইলর্ড।”  

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন বলেন, যে দেশগুলোতে টাকা পাচার হয়, সেই দেশগুলো সহযোহিতা করতে চায় না।

তখন অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বিচারক বলেন, “দেখেন কিছু দিন আগে এই কোর্টেই একটি মামলা করলাম, বাংলাদেশের একজন নাগরিক লন্ডন থেকে কিছু অর্থ নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের ওই লোকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছে এবং তার সমস্ত ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে। যদি ব্রিটিশ সরকার পারে আমরা পরব না কেন?

“যেহেতু আমাদের আইন আছে, আমরা ইনজাংশন দিব, অসুবিধা কী। ওখান থেকে টাকা লেনদেন করতে পারবে না। আমাদের তো সে উপায় আছে। আমরা আদেশ দিয়ে কনসার্ন ব্যাংকে পাঠিয়ে দেব যে, তোমার এই ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ইনজাংশন দেওয়া আছে। তারা কোনো টাকা লেনদেন করতে পারবে না। আমাদের তো ভালো একটা আইন তৈরি করেছে।”

এরপর আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি শুনানির পরবর্তী তারিখ রেখে আদালত আদেশে বলে, “যারা বিদেশে অর্থপাচার করেছে, তাদের কোন জায়গায় কী আছে, কোথায় বসবাস করছেন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যন্য বিবাদী যারা আছে, তারা এই অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কি না বা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চাচ্ছি “

এগমন্ট চুক্তি অনুযায়ী নাম প্রকাশ করা যায় না: অ্যাটর্নি জেনারেল

আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “বিদেশে যেসব মিশন কাজ করে সেসব মিশনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। মিশনগুলো জানানোর জন্য সময় চেয়েছে। সেই চিঠিটি আদালতকে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে মিশন থেকে জবাব আসলে সে জবাবসহ আদালতে জমা দেওয়া হবে।”

এগমন্ট চুক্তি অনুযায়ী বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) কারও নাম প্রকাশ করতে পারে না জানিয়ে তিনি বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী অর্থপাচার সংক্রান্ত কোনো কিছুই আমরা প্রকাশ করতে পারব না আদালতে বা মামলা সম্পর্কিত বিষয়ে। আমরা শুধু তদন্তের কাজে তাদের তথ্য ব্যবহার করতে পারব। তথ্য প্রকাশ করতে গেলে তাদের থেকে অনুমতি নিতে হয়। সেই কারণে আমরা ওদের কাছে অনুমতি চেয়েছি। এর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাইনি, সেটা পেতে একটু সময় লাগবে।”

এক প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কোনো কর্তৃপক্ষ প্রমাণ ছাড়া কারও নাম বলতে পারে না। জানানোর জন্যই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছি। নামগুলো পেলে আমরা জানিয়ে দেব।”

তিনি বলেন, “বিভিন্ন লোক এ নিয়ে কথা বলেছেন, এ কথাগুলো তো আমরা এভাবে আদালতকে দিতে পারি না। তার পরেও আমরা কিছু নাম দিয়েছি। হলফনামা করে বলেছি কার কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে, মামলা আছে। তথ্য-প্রমাণসহ যে নামগুলো আমরা পেয়েছি, তার সবগুলোই দিয়েছি আমরা। আশা করছি আগামী তারিখে আমরা ইতিবাচক কিছু দিতে পারব।”

যে প্রতিবেদন দিয়েছে দুদক

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুদক ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচারের অপরাধে ৪৭টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। আর এ সংক্রান্ত ৮৮ টি মামলা তদন্ত করছে দুদক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালের কাফরুল থানার এক মামলায় (আরাফাত রহমান কোকোর মামলা) পাচারকৃত প্রায় ২১ কোটি টাকা পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হয়েছে। এছাড়া একই সালের ক্যান্টনমেন্ট থানায় এক মামলায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা ফেরত এনে রাষ্ট্রের অনুকুলে জমা করা হয়েছে।

২০১৪ সালে রমনা থানার মামলায় ব্রিটেনে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৮ লাখ ৮ হাজার ৫৩৮ পাউন্ড জব্দ করা হয়েছে। ২০১৩ সালের গুলশান থানার এক মামলায় মোরশেদ খানের ১৬ মিলিয়ন হংকং ডলার জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১১ সালের ক্যান্টনমেন্ট থানার এক মামলায় গিয়াস আল মামুনের ৪ লাখ ১৮ হাজার ৮৫৩ পাউন্ড জব্দ করা হয়েছে।

কানাডার এফআইইউ’র কাছে বিএফআইইউ অনুরোধ 

যে সকল বাংলাদেশি কানাডায় অর্থ পাচার করেছে, তাদের নাম ও ঠিকানা যত দ্রুত সম্ভব পাঠাতে কানাডার এফআইইউ’র কাছে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

তা জানিয়েই বৃহস্পতিবার হাই কোর্টে প্রতিবেদন দিয়েছে বিএফআইইউ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট ২০১৫ থেকে ২০২০ অর্থ বছরে দুদক, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ ও এনবিআরকে ৩২২৮টি আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছে। 

“বিএফআইইউ আন্তর্জাতিক সংস্থা এগমন্ট গ্রুপের সদস্য। তাদের কাছ থেকে পাওয়া গোপনীয় তথ্য তৃতীয়পক্ষের কাছে দিতে বাধা আছে। তাই বিএফআইইউ তাদের নীতি মানতে বাধ্য। তাদের কোনো নীতি ভঙ্গ হলে সদস্যপদ বরখাস্ত বা বাতিল করতে পারে। যেমনটা ঘটেছে নাইজেরিয়া ও এল সালভাদরের ক্ষেত্রে।”

তবে আদালতের আদেশের পর বিএফআইইউ কানাডার এফআইউ’র কাছে অনুরোধপত্র পাঠিয়েছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, “যে সব বাংলাদেশি কানাডায় মানি লন্ডারিং করেছে তাদের নাম ও ঠিকানা দ্রুত পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু এফআইইউ এখনও সাড়া দেয়নি।”

অর্থ পাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য চেয়ে কানাডার বাংলাদেশ হাইকমিশন বরাবর দুটি জরুরি ফ্যাক্স বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থপাচার সংক্রান্ত ৯৩টি মামলা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

আর সিআইডির তাদের প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কায় অর্থ পাচারের কয়েকটি মামলার তথ্য দিয়েছে।

আহমদ শফীকে ‘হত্যার’ অভিযোগে মামুনুলসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা,তদন্তের নির্দেশ পিবিআইকে

0

হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির শাহ আহমদ শফীকে ‘মানসিক নির্যাতন করে পরিকল্পিতভাবে’ হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেছে তার পরিবার।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শিপলু কুমার দের আদালতে শফীর শ্যালক মো. মইন উদ্দিনের করা এই মামলায় ৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই হেফাজতে ইসলামের বর্তমান আমির জুনাইদ বাবুনগরীর অনুসারী।

বাদীর আইনজীবী আবু হানিফ জানান, “আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে।” বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে মাওলানা মো. নাসির মুনিরকে। আর দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতার জন্য আলোচনায় আসা হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে।

ছবি- মামনুল হক

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কেন্দ্রীয় নেতা মীর ইদ্রিস, হাবিব উল্লাহ, আহসান উল্লাহ, জাকারিয়া নোমান ফয়েজীর নামও রয়েছে আসামির তালিকায়। 

আইনজীবী আবু হানিফ বলেন, “আসামিরা মানসিক নির্যাতন করে আল্লামা শফীকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।” 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হেফাজতে ইসলামের সর্বোচ্চ নেতা ও হাটহাজারী মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের পরিচালক আহমদ শফী মারা যান।

তার আগের দিন শফীর অব্যাহতি এবং তার ছেলে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক আনাস মাদানির বহিষ্কার দাবিতে মাদ্রাসায় বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

সেই দ্বন্দ্বের জেরে ১৭ সেপ্টেম্বর শূরা কমিটির বৈঠকে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মহাপরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন ‘বড় হুজুর’ শফী।

ওই বৈঠকে শফীর ছেলেসহ দুই শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় দৃশ্যত আহমদ শফীর সুদীর্ঘ দিনের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে।

সেই বৈঠকের পরপরই আহমদ শফীকে মাদ্রাসা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়া হলে পরদিন তিনি মারা যান।

সেদিনই ঢাকায় সাংবাদিকদের শফীপুত্র আনাস মাদানি বলেছিলেন, আগের দিনের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটনার কারণে ‘টেনশনের’ কারণে ‘হার্টফেইল’ করে তার বাবা মারা গেছেন।

পরে নেতৃত্বের প্রশ্নে হেফাজতে ইসলামী বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জুনাইদ বাবুনগরী আমিরের পদে আসেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি মামুনুল হক এ বছরের ১১ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় এসে হেফাজতের বর্তমান আমীর জুনাইদ বাবুনগরীর সাথে বৈঠক করে আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানিকে বহিষ্কারের দাবি করেন আহমদ শফীর কাছে। আহমদ শফী বিক্ষুব্ধদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।

“আনাস মাদানিকে বহিষ্কার না করলে হেফাজতের তৎকালীন আমীরের চরম ক্ষতি করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয় বিক্ষুব্ধদের পক্ষ থেকে। এ সময় অসুস্থ আহমদ শফীকে বিক্ষুব্ধরা নানাভাবে বিরক্ত করেন এবং হুমকি দেন।

“১৭ সেপ্টেম্বর আহমদ শফীকে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেন এবং তার নাকে লাগানো অক্সিজেন নল খুলে ফেলেন বিক্ষুব্ধরা। এসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার চিকিৎসার জন্য মাদ্রাসার বাইরে আনার চেষ্টা করেও পারা যায়নি।”

আহমদ শফী হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত আল-জমিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ১৯৮৬ সাল থেকে। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের বেফাক) সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।