ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 152

গণহত্যার অপরাধে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাস ঘেরাও, স্মারকলিপি প্রদান

0

একাত্তরের গণহত্যা ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অপরাধে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ শেষে পাকিস্তান দূতাবাস অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ। শাহবাগে মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। মিছিল থেকে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রতিনিধি দলে ছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, ভাস্কর শিল্পী রাশা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক মো: আল মামুন, আইন বিষয়ক সম্পাদক এজেডইউ প্রিন্স ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনেট মাহমুদ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি গ্রহণ করেন ডিপ্লোমেটিক পুলিশের ডিসি আশরাফুল ইসলাম।

সমাবেশের বক্তব্য সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, “পাকিস্তানকে অবিলম্বে গণহত্যার দায় স্বীকার করে বাংলাদেশের নিকট রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তান দূতাবাস এখনো ষড়যন্ত্র চলমান রেখেছে। পাকিস্তান দূতাবাসের কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।”

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, “পাকিস্তানকে একাত্তরের গণহত্যা ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের অপরাধে দ্রুত ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় গণহত্যার অপরাধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবো। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আমরা এদের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিবো।”

সমাবেশে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আল মামুন বলেন, “আজ ১৪ ডিসেম্বর: শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙ্গালি জাতির জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্টদায়ক দিন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আজকের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা করেছিলো জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের। প্রতিথযশা লেখক, কবি, সাহিত্যক, চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানীদের কে রাতের আঁধারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানি জান্তারা যখন বুঝতে পেরেছিল যে, তারা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হতে যাচ্ছে ঠিক তখনই জাতিকে মেধা শূন্য করার জন্য এদেশীয় রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের সহযোগিতায় হত্যা করেছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা দিয়ে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত ত্রিশ লক্ষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী। এদের দ্বারা দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিল। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি পাকিস্তানী দোসররা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। লাল-সবুজের পতাকা আবারও খামচে ধরতে চায় পুরনো শকুনেরা। সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাংচুরের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আঘাত দিয়েছে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পাকিস্তানের দোসর মামুনুল-ফয়জুল গংরা। বিজয়ের মাসে একাত্তরের পরাজিত অপশক্তিদের আবারও পরাজিত করতে হবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর অবমাননার মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে অবমাননা করা হয়েছে। পাকিস্তানী দোসররা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। সংবিধান লঙ্ঘনকারী ও জাতির পিতার অবমাননাকারী ধর্ম ব্যবসায়ী মামুনুল-ফয়জুল গংদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য দাবি জানাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে একাত্তরের গণহত্যার দায় স্বীকার করেনি। এখনও পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানাবিধ ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। একাত্তরের গণহত্যা, শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি একই সূত্রে গাঁথা। পাকিস্তানকে অবশ্যই এসব নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বাংলাদেশের নিকট রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। পাকিস্তান দ্রুত ক্ষমা না চাইলে বাংলাদেশ সরকারকে পাকিস্তানের সাথে সকল ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হব। অন্যথায় সমগ্র দেশে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ আরোও কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করবে।”

ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে : ড. হাছান মাহমুদ

0

ভারতের বন্ধুত্বের সঙ্গে অন্য কারও বন্ধুত্বের তুলনাই হয় না। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক-সহ বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। ভারতের বহুভাষী সংবাদ সংস্থা ‘হিন্দুস্থান সমাচার’-এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমনই জানিয়েছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তাঁর কথায়, “ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।” বাংলাদেশে বিএনপি-জামাতের ভারত বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সীমান্তের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরের দিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে চিনের স্বীকৃতি দেওয়া, ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্ক-সহ বিভিন্ন বিষয়ে হিন্দুস্থান সমাচার-এর বাংলাদেশের প্রতিনিধি কিশোর সরকারকে বিশেষ স্বাক্ষাৎকার দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

হিন্দুস্থান সমাচার: বিএনপি-জামাত সর্বদাই অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে প্রভু মনে করে, এক্ষেত্রে আপনার কী অভিমত?

তথ্যমন্ত্রী : ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের যে অবদান তা বাংলাদেশের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যেমন প্রাণ দিয়েছে, তেমনই মিত্রবাহিনী হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরাও প্রাণ দিয়েছেন। সুতরাং ভারতের বন্ধুত্বের সঙ্গে অন্য কারও বন্ধত্বের তুলনা হয় না। তাই ভারতকে আমরা সর্বদা পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে দেখি, প্রভু হিসেবে নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিএনপি যেভাবে প্রচার করে তা কখনওই তেমন নয়। 

তিনি আরও বলেন, যেহেতু ভারত আমাদের প্রতিবেশী, তাই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক-সহ বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে ভারতবর্ষ। সুতরাং ভারতবর্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়াই স্বাভাবিক। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিএনপি যে রাজনীতিটা করে তা ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি। যদিও পর্দার অন্তরালে তারা ভারত তোষণের রাজনীতিটাই করে। যেটি আওয়ামী লীগ করে না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুরোটাই উন্মুক্ত এবং আমরা মনে করি আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকা উচিৎ। আর ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমেই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে।

হিন্দুস্থান সমাচার : বিএনপি-জামাতের অভিযোগ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন পদে পদোন্নতি ও বদলি করা হচ্ছে, আপনি কী মনে করেন?

তথ্যমন্ত্রী : এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালিরা সেটি মেনে নেয়নি। কারণ, আপামর বাঙালি মনে করেন, আমদের প্রথম পরিচয় আমরা বাঙালি। আমাদের দ্বিতীয় পরিচয় হচ্ছে, আমরা কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউবা খ্রিস্টান। এটাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বুকে ধারণ করে, লালন করে। কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে একটা ভিন্নতা আছে। তারা মনে করে, মানুষের আগে পরিচয় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান হিসেবে। এরপরে তারা বাঙালি না বাংলাদেশী এই নিয়েও দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে। বিএনপি সর্বদা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ায়। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে সংখ্যালঘুদের যোগ্যতা থাকা সত্বেও তাদের পদোন্নতি বা বদলি করা হয় নি। আওয়ামী লীগ সরকার যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে নয়। 

হিন্দুস্থান সমাচার : শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরবর্তী দিনই, বাংলাদেশকে চিনের স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে আপনার কী অভিমত?

তথ্যমন্ত্রী : আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারত যেমন আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ভারতের রাস্তায়-রাস্তায় শরণার্থীদের জন্য চাঁদা তোলা হয়েছে। ভারতের সাধারণ মানুষ শরণার্থীদের জন্য চাঁদাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের শরণার্থীদের যে শুধু শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল তা কিন্তু নয়, সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষেরা নিজেদের বাড়িতেও আশ্রয় দিয়েছেন। এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দেওয়া চারটিখানি কথা নয়! তখন অনেক দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাও করেছে। কোন রাষ্ট্রগুলো বিরোধিতা করেছে, সেটি ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। তখন পাকিস্তানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল চিন। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকার কারণেই হয়তো চিন আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবিত থাকাকালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরে চিনও আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। 

হিন্দুস্থান সমাচার : পাকিস্তানে উন্মুক্ত, অথচ বাংলাদেশে ভারতীয় ‘ফিল্ম’ আমদানি নিষিদ্ধ কেন?

তথ্যমন্ত্রী : আকাশ যেমন উন্মুক্ত, তেমনই ভারতীয় সকল ধরনের ছবি বাংলাদেশে আমাদনি উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু, বাংলাদেশের ‘শিল্পী সমিতির’ বাধার কারণে শুধু হিন্দি ছবি আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে, সিনেমা হল মালিকদের ভারতীয় হিন্দি ছবি আমদানি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি আছে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ‘ফিল্ম’ তৈরিতে কোনও বাধা নেই।

মুজিব ভাস্কর্য: ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্ক চলবে না’- দুবৃত্তদের কঠোর হাতে দমন করার অঙ্গীকার, দেশজুড়ে আমলাদের সমাবেশ

0

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর ও অবমাননার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
শনিবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ফোরাম’-এর ব্যানারে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন কর্মসূচিটি সমন্বয় করে।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘আমরা আমাদের জীবদ্দশায় জাতির পিতার প্রতি কোনো রকম অপমান বা অসম্মান হতে দেব না। এটাই আমাদের আজকের অঙ্গীকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জনগণের সেবক। জাতির পিতা আমাদের সংবিধানের অংশ। সংবিধান রক্ষা করাই আমাদের দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবিধানিকভাবে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার সম্পর্ক নিবিড়।’
‘বঙ্গবন্ধুর ওপর কোনো ধরণের আক্রমণ ও অপমান সহ্য করা হবে না,’ যোগ করেন তিনি।
এতে পুলিশের আইজিপি বেনজির আহমেদসহ বিসিএস এর সবগুলোর ক্যাডারের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মহাসচিবরাসহ প্রায় সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা যোগ দেন।
সমাবেশে দেয়া বক্তৃতায় পুলিশের আইজিপি বেনজির আহমেদ বলেন, “স্বাধীনতা, সংবিধান, রাষ্ট্র ও জাতির জনক- নো বডি ক্যান টাচ দেম”।
“আমরা তাদের মোকাবেলা করবো। বঙ্গবন্ধু দেশ, পতাকা, মানচিত্র দিয়েছেন। তার ওপর হামলা সংবিধানের ও রাষ্ট্রের ওপর হামলা। রাষ্ট্র অবশ্যই বিধিবিধান অনুযায়ী কঠোর হস্তে মোকাবেলা করবে”।
বিসিএস অডিট ও অ্যাকাউন্টস এসোসিয়েশনের মহাসচিব গোলাম সারোয়ার ভুঁইয়া বলেন, “জাতির পিতাকে যারা অসম্মান করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করছি”।
বিসিএস কর অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফজলে হায়াত কায়সার বলেন, “বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতোনা, আর বাংলাদেশ না হলে এত ক্যাডার সার্ভিস হতোনা। ভাস্কর্য যারা ভেঙ্গেছে তারা দেশবিরোধী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি”।
বিসিএস শুষ্ক ও আবগারি ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কাস্টমস কমিশনার বলেন, “এখনো এ দেশে কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে যারা জাতির পিতাকে অশ্রদ্ধা করছেন। ভাস্কর্য ভাঙ্গার মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছি”।
তিনি বলেন, “অনেক মুসলিম দেশে ভাস্কর্য আছে। আমরা কি তাহলে বেশি মুসলমান হয়ে গেছি। আসলে তারা স্বাধীনতার প্রতি আঘাত করতে চায়। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বঙ্গবন্ধু- এসব নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই”।
বিসিএস তথ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, “স্বাধীনতার বিপক্ষে যারা থাকবে তাদের বিপক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের কণ্ঠ সোচ্চার থাকবে”।
“ভাস্কর্য মোটেও ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি শিল্পকর্মের অংশ। বাংলাদেশ এটি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে এতো কথা কেন। এটি হলো রাজনীতি। কর্মকর্তাদের স্বাধীনতার প্রশ্নে অবস্থান থাকতে হবে”।
বিসিএস গণপূর্ত ক্যাডারের পক্ষে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, “যারা বাংলাদেশের চাকা পেছনে নিতে চায় সেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে বেছে নিয়েছে”।
“তারা রাতের অন্ধকারে ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে । আমরা এটাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারিনা”।
বিসিএস সড়ক ও জনপথে প্রকৌশলী সমিতি, বিসিএস টেলিকম সমিতি, বিসিএস কৃষি ক্যাডার, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরে বিসিএস কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ সমাবেশে বক্তব্য দেন।
খাদ্য সচিব মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম, আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্ম সচিব বিকাশ কুমার সাহা, বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক আ ম সেলিম রেজা, বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ খন্দকার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক প্রমুখ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে দেশব্যাপী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ঃঃ

বঙ্গবন্ধুর সম্মান অটুট রাখতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজপথে নেমেছে বিচারক-পুলিশসহ প্রশাসন। ভাস্কর্য অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়ে শনিবার (১২ ডিসেম্বর) সকাল থেকে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন, মৌন মিছিল এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।

জাতির পিতার সম্মান অটুট রাখার অঙ্গীকারে মাঠে নামেন চট্টগ্রামের বিচারক-পুলিশসহ প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তারা। ভাস্কর্য অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়ে সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন, মৌন মিছিল এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

নগরীর দামপাড়া থেকে শুরু হয় দিনভর এ কর্মসূচি। প্রথমে মানববন্ধন করেন বিচারক-পুলিশসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এরপর তারা মিছিল নিয়ে সমবেত হন শিল্পকলা একাডেমির মুক্ত মঞ্চে। মুর্হতের মধ্যে পুরো চত্বর লোকে-লোকারণ্য হয়ে উঠে। “জাতির পিতার সম্মান-রাখবো মোরা অম্লান” শ্লোগানে সাজানো মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর বীরগাঁথা শোনানোর পাশাপাশি ভাস্কর্য বিরোধীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে একে একে বক্তব্য রাখেন বিচারকসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তারা।
এতে বক্তব্য রাখেন মহানগর দায়রা জজ আশফাকুর রহমান, জেলা ও দায়রা জজ ইসমাইল হোসেন, বিভাগীয় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক আবু সাঈদ।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইসমাইল হোসেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এ প্রতিবাদী কর্মসূচিতে বক্তারা যে কোনো মূল্যে জাতির জনকের ভাস্কর্য রক্ষা এবং তার সম্মান অটুট রাখার অঙ্গীকার করেন। তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র শুরু হওয়ার পর প্রথম প্রতিবাদ শুরু হয়েছিলো চট্টগ্রাম থেকেই। এবার চট্টগ্রামের সর্বস্তরে সরকারি কর্মকর্তারা সেই প্রতিবাদের মিছিলে সামিল হলেন।

কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে বাগেরহাটেও মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় বাগেরহাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে জেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা এই প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন, বাগেরহাট জেলা ও দায়রা জজ গাজী রহমান, পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায়, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. খালেদ কনক, বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোছাব্বেরুল ইসলাম, বাগেরহাট সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার বকসী প্রমুখ। এছাড়া বাগেরহাটে কর্মরত সকল সরকারি দপ্তরের দপ্তর প্রধান ও প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন।
 
জাতির পিতার ভাস্কর্য অবমাননার প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের আয়োজনে শহীদ এম মনসুর আলী অডিটরিয়ামে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারিসহ সরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এসময় বক্তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অবমাননা এবং কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।

সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক স্বাধীনতার মহান স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর ও অবমাননার প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে সভা করেছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস।

এদিকে সুনামগঞ্জে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তরা বলেন, ভাস্কর্য ভেঙে স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকিস্তানের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে চায়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোটি কোটি মানুষ তা মেনে নেবেন না।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের সভাপতিত্বে ও সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের পরিচালনায় প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা ও দায়রা জজ ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, সিভিল সার্জন মো. শামছ উদ্দিন,কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুব আলম,বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সৈকত দাসসহ জেলা প্রশাসন ও জেলায় কর্মরত বিভিন্ন অফিস প্রধানগণ। প্রতিবাদ সমাবেশে জেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, চাঁদপুর, ঝালকাঠি, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মোংলা, ভোলা, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, রাঙামাটি, নাটোর, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

নৈরাশ্যবাদীদের ধারণা ভুল প্রমাণিত, নিজদের টাকায় পদ্মাসেতু করে ভেঙ্গে পড়েনি দেশের অর্থনীতি

0


বিড়াল কালো না ধলো সেটা দেখার দরকার নেই। বিড়াল ইঁদুর মারে কি না সেটাই বিবেচ্য।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ লক্ষ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাক, সেতু শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলো এটাই সত্য।
প্রকল্পের টাকা লুট হয়, সরকারি মাল দরিয়ায় ঢালা হয় এগুলো চিরন্তন সত্য। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতো টাকা বিদেশী সাহায্য এসেছে তার অর্ধেকও যদি সঠিক প্রয়োগ হতো তা হলে দেশের প্রতিটি পরিবারের একটি করে দ্বিতল পাকা বাড়ি থাকতো, অন্ন বস্ত্রের নিশ্চয়তা হতো।
কিন্তু বিদেশী সাহায্যের ২০ থেকে ৩০ পার্সেন্ট পর্যন্ত প্রকল্পের কাজে ব্যয় হয়, সাধারণ মানুষের কল্যাণে পৌঁছে। বাকিটা নয়ছয় হয় বা লুট হয়। এমন হিসেব বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনেছি।
যতো বড় প্রকল্প ততো বেশী লুটপাট,কমিশন। এটা হয় বলেই মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম হয়,অষ্ট্রেলিয়া, কানাডায় বেগম পাড়া হয়, দেশে আমলা কামলারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়।
আমরা এসব জানি। মিডিয়ার সুবাদে আরও বেশী জানি,বেশী খবর রাখি ও খবর পাই।
দেশী টাকায় হউক আর বিদেশী টাকায়ই হউক যে কোনো কেনাকাটায় এমন কি একটা আলপিন কিনতে হলেও কমিশন দিতে হয়।
এটা সবাই জানে। দুদক জানে, পুলিশ জানে, আর্মি জানে, সচিব জানেন, মন্ত্রী জানেন।
আমরাও জানি। প্রকল্পের পিডি নিয়োগে কতো কতো তদ্বির,শর্ত নির্ধারণ করা হয় তা যে কোনো প্রকল্পে অনুসন্ধান করলেই জানা যায়। ডিপিএম,ওটিএমের নামে কি দুর্নীতি হচ্ছে তা নিউজের কাজে সংশ্লিষ্ট হলেই বুঝা যায়।
শতভাগ তথ্যপ্রমাণ পেলেও নিউজ করার হিম্মত নেই। নিজে করতে পারিনি, অনেক বাঘা সাংবাদিককে তথ্যপ্রমাণ দিয়েছি। কিন্তু তাদেরও হিম্মত হয়নি নিউজ করার।
তাই কমিশনটাও প্রকল্পের অংশ বলেই আমি ধরে নিয়েছি। এ কারণে এটার এখন আর নিউজ ভ্যালু আছে বলে মনে করি না। সরকারি কেনো? বেসরকারি কেনাকাটাতেও কমিশন লাগে। এক মিডিয়া হাউজে দেখেছি বিকেলের নাস্তা, রাতের খাবার থেকেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীলকে কমিশন দিতে হতো যারা খাবার সাপ্লাই দিতো তাদের। একই অবস্থা পত্রিকা,এনজিওসহ ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানে পর্যন্ত।
কাজেই কমিশন, দুর্নীতি, লুটপাট এসব এখন গাসওয়া হয়ে গেছে, স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
মিডিয়ায় সময় সুযোগ পেলে খবর হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে খবর হয়। দুদক উপরের কোনো নির্দেশনা পেলে ডেকে নিয়ে আসে। মিডিয়ার খবর দেখে তারা ডাকে, পরে আর খুব একটা খবর হয় না।
এসব আমরা জানি। খবরের কারবারির অভিজ্ঞতা থেকে জানি। ২০ বছরে চোখের সামনে কতোকিছু লুট হতে দেখলাম। কতোজনকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে দেখলাম। এখন আর অনুভূতি কাজ করে না।
তারচেয়ে মনে করি, লুট হতে হতে যে কাজটুকু হয় সেটাই দেশের লাভ, আমাদের লাভ। ৫ বছরের কাজ ১০ বছরে হয়েছে। প্রকল্পের খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। আপত্তি নেই। হয়েছে তো। এটাই বোনাস। টাকা লুট হয়েছে। হোক। কারও না কারও পকেটে তো গেছে। সে তো অন্তত পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো করে বাঁচতে পারছে। বাঁচুক, সেটাই বা কম কিসে। সে প্রাডো চড়ুক, পাজারো চড়ুক। আমরা যে ৮ নাম্বার বাসে চড়তে পারছি সেটার জন্যই ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা।এটা নিয়ে এতো আফসোসের কিছু নেই।
এতো কথা বললাম,কারণ শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু হয়েছে। শেষ স্প্যান বসেছে। এই সেতু নিয়ে কতো কথা। শেখ হাসিনা সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল বিশ্বব্যাংক আর দেশের কিছু মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি। তাদের মিথ্যা তথ্য, পরিকল্পিত মিথ্যাচার আমরাও প্রথমে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্ত বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন এবং প্রমাণ করতে বললেন তখন কিন্তু নানা চেষ্টা করেও তারা দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারে নি। ঘৃণাভরে শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করলেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ণকে। বললেন আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতু করবো। শেখ হাসিনা দেখিয়ে ছাড়লেন তিনি যা বলেন তা করেন। আজ পদ্মাসেতু হয়েছে। বিজয়ের মাসে বাঙালী আরেক বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। এটাই সত্য। বৃহস্পতিবার পদ্মাসেতুর সর্বশেষ (৪১তম) স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে যখন নদীর দুই প্রান্ত ছুঁয়ে এক হলো তখন দেশের বেশিরভাগ মানুষ আনন্দে আপ্লুত হলেও অনেকের মনেই দেখেছি বিষাদের ছায়া। যারা বলেছিলেন এ সরকার পদ্মাসেতু করতে পারবে না, করলেও জোড়াতালি দিয়ে একটা করে রাখবে, যারা বলেছিলেন এ সেতু হলেও তারা তা ব্যবহার করবেন না, তারা এখন লজ্জায় মুখ লুকোচ্ছেন। তাদেরই একজন বুদ্ধিজীবী, যিনি একসময় ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তির মিডিয়াদূত ছিলেন, দেখলাম ফেসবুকে বিশাল লেখা লিখেছেন। পদ্মাসেতুর খরচের হিসাব চাচ্ছেন, জনগণের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হলো হিসাব দিতে বলেছেন।
আমি মনে করি এসব হিসেব নিকেশ চেয়ে লাভ নেই, দরকারও নেই। দরিয়া বাঁধাই করতে টাকা দরিয়ায় ঢালা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দরিয়া বাঁধাই হয়েছে এটাই নির্ভেজাল সত্য। আপনারা নিজেরা কিছু করতে পারেন না, করেনও না। কাজ করতে হলে হিম্মত লাগে।
আপনারা কখনও ভেবেছিলেন রাজধানীতে মেট্রোরেল হবে? কিন্তু হচ্ছে এটাই সত্য।
আপনারা কখনও ভেবেছিলেন কর্নফুলি নদীর তলদেশে টানেল হবে? কিন্তু হচ্ছে এটাই সত্য।
দেশে অবকাঠামো খাতে গত ১০ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে সেটা বিষ্ময়কর। এসব সত্য স্বীকার করতে হবে। বড় প্রকল্পের টাকা নয়ছয় হবে এসব মেনে নিয়েই উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে হবে।
পদ্মাসেতু দুর্নীতি নিয়ে যখন বিশ্বব্যাংক আঙুল তুলেছিল তখন দেশের কথিত কিছু বুদ্ধিজীবী, কিছু অর্থনীতিবিদের হায় হায় বক্তব্য এখনও মনে পড়ে। মনে হয়েছিল দেশটা শেষ, শেখ হাসিনা শেষ করে দিয়েছেন। পরে যখন দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারেনি তখন এরা নিশ্চুপ হয়ে যান। কিন্তু শেখ হাসিনা যখন বললেন, কারও সাহায্যে নয়, নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতু বানাবেন তখন সেই হায় হায় বিশারদরা যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। তারা বলতে থাকলেন নিজেদের টাকায়
এতোবড় প্রকল্প করা সম্ভব না এবং করলে দেশের অর্থনীতির উপর চাপ পড়বে।
কিন্তু তাদের এই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। ভুল প্রমাণিত হলো। এখন স্বপ্নের পদ্মাসেতু বাস্তবতা। বছরখানেকের মধ্যে যানবাহন চলাচল শুরু হবে। নিজেদের অর্থে পদ্মাসেতু বানিয়ে দেশের অর্থনীতিও ভেঙ্গে পড়ে নি। বরং দেশ এগিয়ে যাবে।

বিরোধ নিষ্পত্তিতে নগর আদালত প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য’

0

স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালতের আদলে সিটি করপোরেশনে নগর আদালত প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। দেশের সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এ ধরনের সালিশী আদালত কাজ করবে।
আইন, আদালত, সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় এ আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন আলোচকরা।

মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন উদ্যোগে সংস্থাটির কার্যালয়ে শুক্র ও শনিবার দুদিনব্যাপী এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ব্লাস্ট, নাগরিক উদ্যোগ, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, বাংলাদেশ যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালার সহযোগিতায় ছিল ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম।

কর্মশালায় শুক্রবার নগর আদালত নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, সালিশ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি জনপ্রিয় ব্যবস্থা৷ স্বল্প সময়ে এই পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মামলাজট নিরসন করা সম্ভব। সালিশের জন্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে গ্রাম আদালত ও পৌর কর্পোরেশন আছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনে সেধরনের আইনি কোনো সালিশী ব্যবস্থা নাই।

তাই বক্তারা এজন্য নগর আদালত আইন প্রণয়নের দাবি জানান। এধরনের প্রস্তাবিত একটি আইনের খসড়াও তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। সেই খসড়া নিয়ে আলোচকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
কর্মশালায় আলোচনায় অংশ নেন ব্লাস্টের সম্মানিক নির্বাহী প্রধান ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, মাদারীপুর লিগ্যাল এইডের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মাদারীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও মাদারীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান, মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম বাবু চৌধুরী, মাদারীপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র সাইদা সালমা, কাউন্সিলর ডেইজি আফরোজ, মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট খান মো. শহীদ, সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম মিয়া।

শনিবার মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নে সরাসরি গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেন অংশ নেয়া সাংবাদিকরা৷

কর্মশালায় ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাশহুদুল হক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, সিনিয়র সদস্য আশরাফ-উল আলম, এমএ নোমান, এলআরএফ এর সহ-সভাপতি আজিজুল ইসলাম পান্নু, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইয়াছিন, যুগ্ম সম্পাদক সাইদুল ইসলামসহ ২৩ জন সদস্য অংশ নেন৷ প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

হয়ে গেলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু, দেশের মানুষের মনে উচ্ছ্বাস, যান চলবে ২০২১ এর ডিসেম্বরে

0

দক্ষিণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল পদ্মার পাড়ে, তা পূর্ণ অবয়ব পেল বৃহস্পতিবার।

বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেতুর মাওয়া প্রান্তের ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর ঠিকঠাক বসে গেল টু-এফ নম্বর স্প্যানটি।

আর এর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এই সেতুর পুরো মূল কাঠামো দৃশ্যমাণ হল; তৈরি হল রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের পথ।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, এরপর দ্বিতল এই সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো হয়ে গেলেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

এক বছরের মধ্যেই সেতুটি চালু করা যাবে বলে ইতোমধ্যে আশা প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
এই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে পদ্মাপাড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। কেবল পদ্মার দুই তীরের বাসিন্দারা নন, ঢাকা থেকেও অনেকে আসেন সেতুর শেষ স্প্যানটি বসানোর কাজ নিজে চোখে দেখতে। নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোট ভাড়া করে তারা নদীতে কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান নেন। শেষ স্প্যানটি বসানো হয়ে গেলে উল্লাস প্রকাশ করেন তারা।

নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, গত শুক্রবার পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে ছয় কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়। ৪১তম স্প্যানটি বসাতে বুধবারই সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়।

৩২০০ টন ওজনের ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগের কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে নিয়ে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে পৌঁছে যায় ভাসমান ক্রেইন ‘তিয়ান ই’। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় হালকা কুয়াশার মধ্যেই ইঞ্চি মেপে শুরু হয় স্প্যান স্থাপনের কাজ।

বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেই কাজ শেষ হলেই মুন্সিগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা পর্যন্ত পদ্মার এপার-ওপার যুক্ত হয়ে যায় বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
স্বপ্নপূরণে প্রস্তুত পদ্মাপাড়

যে ৪১টি স্প্যান দিয়ে পুরো পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে জাজিরা প্রান্তে ২০টি বসানো হয়েছে, আর মাওয়া প্রান্তে বসানো হয়েছে ২০টি স্প্যান। একটি স্প্যান বসেছে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে।

দ্বিতল এই সেতুতে স্প্যানের ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হলেই পিচ ঢালাই হবে। ২২ মিটার প্রশস্ত এই সেতুতে চারটি লেইনে যানবাহন চলতে পারবে। আর নিচ দিয়ে এক লাইনে চলবে ট্রেন। ওই এক লাইনেই মিটারগেজ ও ব্রডগেজ- দুই ধরনের ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা হচ্ছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য (মুন্সীগঞ্জ-২) অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, “নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করে বাঙালি বিশ্বর সামনে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিল। এর মূলে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।”

এই সেতু বাস্তাবায়নের জন্য যাদের ত্যাগ, শ্রম, ঘাম রয়েছে, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই সেতুর সুফল ভোগ করবে পুরো জাতি।” ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে পুনরায় পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আসে বিশ্ব ব্যাংক।

কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে থাকে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে সেতু নির্মাণের জন্য প্রাক-যোগ্যতা দরপত্র মূল্যায়ন করে পাঁচ দরদাতাকে বাছাই করে তা বিশ্ব ব্যাংকের অনাপত্তির জন্য পাঠানো হলেও সংস্থাটি তা ঝুলিয়ে রাখে।

এরপর পদ্মা সেতুতে ‘সম্ভাব্য দুর্নীতির’ অভিযোগ আনে বিশ্ব ব্যাংক। দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংককে ‘না’ বলে দেয়।

সেই টানাপড়েনে একজন মন্ত্রীকে সরে যেতে হয়, তখনকার সেতু সচিবকে দুদকের মামলায় কারাগারেও যেতে হয়। অভিযোগের সত্যতা না থাকায় সেই মামলায় পরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় দুদক। কানাডার আদালতেও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত নকশা অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় সেই বিপুল কর্মযজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় প্রথম স্প্যান।
মোট ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু মাঝে ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া গেলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। তাতে বাড়তি সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। এরপর করোনাভাইরাস মহামারী আর বন্যার মধ্যে কাজের গতি কমে যায়। সব বাধা পেরিয়ে অক্টোবরে বসানো হয় ৩২তম স্প্যান। এরপর বাকি স্প্যানগুলো বসানো হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই।
মূল সেতু নির্মাণের কাজটি করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি কোম্পানি সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।

সিনোহাইড্রো করপোরেশনই পদ্মা সেতুর জন্য নদী শাসনের কাজ করছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত সে কাজের ৭৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছিল।
৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে মোট দেশজ উৎপাদন এক দশমিক দুই শতাংশ বাড়বে এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমবে বলে সরকার আশা করছে।

বৈষম্য বিরোধ আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, জানালেন আইনমন্ত্রী; বললেন, করোনা পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ্য করা হবে না

0

সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনকে অত্যন্ত ঘৃণিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। মানবাধিকারের প্রতি সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তা সব সময় পালন করার চেষ্টা করবে এবং চলমান করোনা পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সরকারের কোন আপোষকামিতা হবে না।
“ঘুরে দাঁড়াবো আবার, সবার জন্য মানবাধিকার” প্রতিপাদ্য নিয়ে মানবাধিকার দিবস ২০২০ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
গৃহ নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব অপরাধ কখনই সহ্য করা হবে না। সরকার জনগণকে সে বার্তা দিয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আইন করে ও সাজা বাড়িয়ে এসব নির্যাতন বন্ধ হবে না। জনগণকেও সোচ্চার হতে হবে। এ ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশনেরও যথেষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে এসব অপরাধ অবশ্যই কমবে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়। এক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন একটি চেক এন্ড ব্যালান্সের কাজ করবে। কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তা প্রথমে সরকারকে জানাবে। এরপর সরকার কোন পদক্ষেপ না নিলে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার কোন বার্তা সরকারকে অবহিত করলে সরকার অবশ্যই সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মুক্ত আলোচনায় উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বৈষম্য বিরোধ আইন আগামী বছর একটি আইন হিসেবে জনগণ দেখতে পাবেন। এই আইন প্রণয়নের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকারের বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে ধারণ করে। কোভিড ১৯ আমাদের মানবাধিকারের গতানুগতিক চিন্তাধারা বদলে দিয়েছে। সেজন্যই অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এবছর ঘুরে দাঁড়াবো আবার, সবার জন্য মানবাধিকার, প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের অভিজ্ঞতা থেকে বেড়িয়ে এসে নতুন করে জীবন সাজাতে হবে এবং সেখানে মানবাধিকারকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের অনেক লঙ্ঘন হচ্ছে। আমাদেরকে এসব অপরাধের জবাব দিতে হবে যাতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সে ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশকেও মোকাবিলা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয় এবং এখানকার মানুষ কোভিড -১৯ এ যথেষ্ঠভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে জনগণের জীবন-জীবিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য। জনগণের জীবন-জীবিকার স্থিতি দেওয়ার জন্য সরকার ১৪.১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। দরকার হলে আরও প্রণোদনা দিবে।

তিনি বলেন, সরকার বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এ রোগের ভ্যাক্সিনও বিনামূল্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনগণকে দেওয়া হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মূখার্জী, বাংলাদেশে জাতিসংঘর আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো, কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরকারী ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

0

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ‘ভাঙচুরকারী, অপরাধী ও ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে সংবিধান এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
সেই সঙ্গে ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে এবং এসব বিষয়ে জনমনের বিভ্রান্তি দূর করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও বায়তুল মোকারম মসজিদের খতিবকে তাদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতির পিতার ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার রুলসহ এ আদেশ দেয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
জাতির পিতার ভাস্কর্যের সুরক্ষা, যথাযথ মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে ‘স্বার্থান্বেষী মহল, ভাঙচুরকারী ও অপরাধীদের’ বিরুদ্ধে সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং ভাঙচুরকারী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবাদীদের নিস্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
স্বরাষ্ট্র সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ প্রধান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।  
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মনজুরুল হক ও নাহিদ সুলতানা যুথী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
পরে আইনজীবী মনজুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত রুল জারি করেছেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ যেসব বিবাদী রয়েছে, তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।”
গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলার মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্যপরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়।
একই দিনে রাজধানীর বিএমএ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শানে রিসালাত কনফারেন্সে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করেন।
এরপর গত ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক মাহফিলে অংশ নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনাইদ বাবুনগরী হুমকি দেন, যে কোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা ‘টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেওয়া’ হবে।
তাদের এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেই শুক্রবার গভীর রাতে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের ভাঙচুর চালানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ দেশের সব ভাস্কর্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গত রোববার হাই কোর্টে এই রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উত্তম লাহিড়ী।
ওই দিন দুপুরে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাই কোর্ট বেঞ্চে রিটটি উপস্থাপন করেন আইনজীবী নাহিদ সুলতানা যুথি।
পরে রুলের শর্ত সংশোধন করে আরেকটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। মঙ্গলবার সংশোধিত আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদেশ দিল উচ্চ আদালত।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা: গণপরিষদ ও সংবিধান

0

ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও (অনূদিত)।

এভাবেই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্য রাতের পরে পাকিস্তান দখলদার হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারের পূর্ব মূহুর্তে প্রদত্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ওই ঘোষণা মুহূর্তেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ওই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। শুরু হয় সশস্ত্র লড়াই-সংগ্রাম। অবশেষে অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১।

স্বাধীনতা অর্জনের পর ২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ, ১৯৭২ (Constitutent Assembly of Bangladesh order,1972) জারির মাধ্যমে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ গণপরিষদ। তবে বহিস্কৃত ও পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী সদস্যরা গণপরিষদের সদস্য পদ লাভের অযোগ্য ছিলেন। বাংলাদেশ গণপরিষদ এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১০ এপ্রিল ১৯৭২।

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং তাদের শপথ গ্রহণের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মাহুতি দানকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি গণপরিষদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব অনুসারে শোক প্রস্তাব গৃহীত হলে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে এক মিনিট নিরবতা পালনের পর সদস্যরা দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন এবং মাননীয় স্পিকার মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্পিকারের অনুমতি নিয়ে ‘স্বাধীনতা সর্ম্পকীয়’ প্রস্তাব গণপরিষদে উত্থাপন করেন। কয়েকজন সদস্য উত্থাপিত প্রস্তাবটির উপর মতামত দেন। প্রস্তাবটির উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

জনাব স্পিকার সাহেব, আপনার জানা আছে যে, ত্রিশ লক্ষ ভাই-বোনের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা  আমরা পেয়েছি। এই গণপরিষদের সদস্য হিসাবে নিশ্চয়ই তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা স্মরণ করব এবং মনে রাখব। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সে রক্ত যেন বৃথা না যায়।… দলমত নির্বিশেষে যারা স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। …আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্রকে দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেব, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। …আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তারা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের পর স্পিকার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ সম্পর্কিত প্রস্তাবটি পরিষদের সামনে উপস্থাপন করেন, যা ছিল নিম্নরূপ-

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরাঙ্গনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙালি, সাবেক ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, আজকের দিনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদ সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করছে। 

১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিব নগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল এই সঙ্গে গণপরিষদ তাতে একাত্মা প্রকাশ করছে। 

স্বাধীনতা সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সঙ্গেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে। 

এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ, যথা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

প্রস্তাবটি গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটির সহজ পাঠ ও বিশ্লেষণে মূলত চারটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যণীয়-

এক. বাংলাদেশ গণপরিষদ স্বাধীনতা সংগ্রামে রক্তদানকারী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করেছে;

দুই. গণপরিষদ ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা, যা পরবর্তিতে ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ ‘স্বাধীনতা সনদে’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল তা অনুমোদন করেছে;  

তিন. গণপরিষদ মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা ‘স্বাধীনতা সনদ’ অনুমোদন করেছে; এবং

চার. গণপরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত আদর্শ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য উপরোক্ত সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছিল।

গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০-এ বিধান করা হয় যে- ‘সংবিধানের অন্য কোন বিধান সত্ত্বেও চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত ক্রান্তিকালিন ও অস্থায়ী বিধানাবলী কার্যকর হবে।’ চতুর্থ তফসিল-এর অনুচ্ছেদ ৩(১)-এ উল্লেখ করা হয়-

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে এই সংবিধান প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত বা প্রণীত বলিয়া বিবেচিত সকল আইন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা যে কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত কর্তৃত্বের অধীন অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রযুক্ত সকল ক্ষমতা বা কৃত সকল কার্য এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইনানুযায়ী যথাযথভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।

‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা ‘সনদকে’ গণপরিষদ তো বটেই সাংবিধানিকভাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং তা সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ  করা হয়েছে-

“…,

এবং 

যেহেতু এইরুপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ড রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান, 

এবং
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৫০ সংশোধন অর্থাৎ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র-কে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভাষণ ও দলিল উল্লেখে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ওই ভাষণ ও দলিলসমূহ সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল হিসেবে সংযোজিত হয়েছে। 

২৬শে মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০ অনুযায়ী মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭খ-এর দ্বারা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ (নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে) এবং একাদশ ভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০ সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য করা হয়েছে। 

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬শে মার্চ ১৯৭১-এ প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি করার যে কোন অপচেষ্টা গণপরিষদের কর্তৃত্ব-কে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি সংবিধান লংঘনের শামিল এবং রাষ্ট্রদোহিতা মূলক একটি অপরাধ। 

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক (১) (খ)-এ উল্লেখ আছে- সংবিধান বা এর কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে বা তা কার্যকর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে-তার এই কার্য ‘রাষ্টদ্রোহিতা’ হবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে।

অনুচ্ছেদ ৭ক(২)- এ উল্লেখ করা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি উপরোক্ত দফা (১)-এ বর্ণিত কার্য করতে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করলে কিংবা কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করে- তবে তার এইরুপ কার্যও একই অপরাধ হবে। 

বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ পনের খণ্ডের সিরিজ গ্রন্থের ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রণকৃত তৃতীয় খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন’ মর্মে বর্ণনা করা হয়। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থ সিরিজের ২০০৪ সালের ওই পুনর্মুদ্রণটির তৃতীয় খণ্ড বাজেয়াপ্ত এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক এম এ সালাম।

বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এর সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ উক্ত রিট মোকদ্দমাটি শুনানি অন্তে ২১ জুন ২০০৯ তারিখের এক রায়ে ২০০৪ সালে পূর্নমুদ্রিত বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ -এর তৃতীয় খণ্ডের ১ম পৃষ্ঠায় ‘মেজর জিয়ার প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা’ শিরোনামে মুদ্রিত বর্ণনা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় সাংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০ এর সাথেও সাংঘর্ষিক এবং সংবিধান পরিপন্থী মর্মে ঘোষণা করেন; এবং উপরোক্ত খণ্ডটি বাজেয়াপ্ত করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায় সকল কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তি’র জন্য অবশ্যই পালনীয় এবং বাধ্যকর।
যে সকল ব্যক্তি-মহল জেনে বুঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিতর্কিত করার অপতৎপরতা-অপচেষ্টা করেন তারা নিঃসন্দেহে জ্ঞানপাপী, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী।
৭২-এর সংবিধান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণা।
( সৌজন্যে ঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)।
লেখক পরিচিতি ঃ এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।

বেগম রোকেয়ার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে শিক্ষার স্বপ্ন শিখরে পৌঁছে গেছে নারীরা

0

শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। সকলের সম্মিলিত সেই আলো সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করে। সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন হয়ে থাকে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে আজ থেকে চারশত বছর আগে ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের উক্তি “শিক্ষা শক্তি”। সে সময় শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চায় ইউরোপের দেশগুলো এগিয়ে গেলেও বিশ্বের বৃহৎ ভুখন্ড ভারতীয় উপমহাদেশ পড়ে থাকে অন্ধকার ও কুসংস্কারচ্ছন্নতাকে আকড়ে ধরে। হাজার বছরের পুরুষ শাসিত পশ্চাদপদ সমাজ ব্যবস্থায় মেয়ে শিশুদের বেড়ে উঠতে হতো শিক্ষা ছাড়াই। বৈষম্য নিয়ে শুরু হতো মেয়ে শিশুদের জীবন। পরিবার থেকেই দেওয়া হতো একের পর এক বিধি নিষেধ। ঘরের বাইর পা দিলেই শত শত নিয়ম কানুন। সব মিলিয়ে পরিবার ও সমাজ থেকে পায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো অদৃশ্য শিকল। মানুষ হয়েও তারা পটে আকা ছবির মত স্থির ও নিশ্চুপ। না আছে কোনো শব্দ, না আছে ঘুরে দাড়ানোর শক্তি। সেই পিছিয়ে পড়া, বৈষম্য, কুসংস্কার ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মুসলিম সমাজের চিত্র সবার সামনে তুলে ধরে ছিল বেগম রোকেয়া। উপমহাদেশের নারী সমাজের নিকট শিক্ষার আলোকবর্তিকা। সুসাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী ও আধুনিক সমাজ সংস্কারক। সকল সামাজিক অসঙ্গতি, ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্তপুরবাসিনী নারীদের মুক্তির দূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া হোসেন।
আজকে শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হয় তাদের সুপ্ত প্রতিভা।, শিক্ষা ছাড়া নারীর অগ্রগতি ও মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি নারী শিক্ষার জন্য সকল বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে এগিয়ে যান। তিনি তার নিজের, পরিবারের ও সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নারী যদি শিক্ষিত না হয় তবে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে না। আর নারীদের প্রকৃত মুক্তির জন্য দরকার অর্থ উপার্জন বা আয় করার ক্ষমতা। এজন্য তিনি জীবনের প্রথম দিকেই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। নিজের বিভিন্ন লেখায় শিক্ষাকে নিয়ে এসেছেন। লেখায় চারপাশের বিভিন্ন প্রচলিত উপমা ও উপকরণ ব্যবহার করেছেন এতে মানুষ যেন নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। নারী শিক্ষার বিষয়ে তিনি লেখেন, “শিক্ষা স্ত্রী লোক- পুরুষ নির্বিশেষে সর্বদা বাঞ্ছনীয়। স্থলবিশেষে অগ্নি গৃহদাহ করে বলে কি কোন গৃহস্থ অগ্নি বর্জন করতে পারে”। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি আরো বলেন, ‘অন্ততঃ পক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই হইবে। শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি, গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দু’ছত্র কবিতা লিখিতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা- যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ মাতা রূপে গঠিত করিবে। শিক্ষা মানসিক ও শারীরিক উভয়বিদ হওয়া চাই। তাহাদের জানা উচিত যে, তাহারা ইহজগতে কেবল সুদৃশ্য শাড়ি, ক্লিপ ও বহুমূল্য রত্নালঙ্কার পরিয়া পুতুল সাজিবার জন্য আইসে নাই, বরং তাদের বিশেষ কর্তব্য সাধন নিমিত্ত নারী রূপে জন্মলাভ করিয়াছে। তাহাদের জীবন শুধু পতিদেবতার মনোরঞ্জনের নিমিত্ত উৎসর্গ হইবার বস্তু নহে। তাহার অন্ন, বস্ত্রের জন্য কাহারো গলগ্রহ না হয়।
রোকেয়ার স্বপ্নের সাথে আজ আমাদের দেশের নারী শিক্ষার তুলনা করলে দেখি, আমরা তাঁর স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার নারী শিক্ষায় বিশ্বে রোল মডেল। তিনি নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য ২০১৪ সালে ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কারে ভূষিত হন। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ ও সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
একদশক আগে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ যা বর্তমানে শতভাগে উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাত যথাক্রমে ৫০.৭৫ ও ৫৩.৯৯ শতাংশ। আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরা আজ ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। এ যেন বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আজ আমরা দেখি বেগম রোকেয়ার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
সাহিত্যিক হিসেবে বেগম রোকেয়া ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারত মহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ প্রথার কুফল, নারী শিক্ষার প্রতি তার নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অনাচার ও অপমানের কথা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। নারীর অধিকার ও নারী জাগরণ সম্পর্কে তাঁর দুরদর্শী চিন্তাভাবন তাঁর সাহিত্যে বার বার উঠে এসেছে। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তার লেখনি ছিল সোচ্চার। রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে মতিচুর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ।
নারীর স্বাধীনতা, মুক্তির এবং বৈষম্যের বিষয়ে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিলেন বেগম রোকেয়া। সেই সময়ের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেছিলেন, সামাজিক বিধিব্যবস্থার উপর আমাদের (নারীদের) কোন হাত নাই। উড়িতে শিখিবার পূর্বেই আমাদের ডানা কাটিয়া দেওয়া হয়- তদ্ব্যতীত সামাজিক রীতি-নীতির কত শত কঠিন শৃঙ্খল পদে পদে জড়াইয়া আছে”।
-২-
মুসলমান মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের দাবী আদায়ের জন্য ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম বা মুসলিম মহিলা সমিতি’। এই সমিতি থেকে নারীদের আর্থিক সাহায্য এবং কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হতো। সেই অর্থে নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচনা করেন বেগম রোকেয়া। নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের উপর জোর দিয়ে বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন বস্ত্র উপার্জন করুক। কার্যক্ষেত্রেও পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশী, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়।’ উপমহাদেশের পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের প্রতি নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও পর্দা প্রথার নামে অবরুদ্ধ জীবন বেগম রোকেয়াকে বেদনাহত করে তুলেছিল। তাই তিনি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মাধ্যমে চেয়েছিলেন নারীর প্রকৃত মুক্তি।
নারীর অগ্রগতির জন্য আজীবন সংগ্রামী রোকেয়ার অগ্রণী ভূমিকা ছিল নারীর আলোকিত জীবনের জন্য। একাধারে স্কুল পরিচালনা করা, কুসংস্কারচ্ছনা সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও লেখনির মাধ্যমে নারীর সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তোলা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বেগম রোকেয়ার সার্বক্ষণিক ভাবনায় ছিল নারীদের উন্নয়ন। নারীদের স্বপ্ন ও চিন্তাকে গন্ডির মধ্যে আটকে রাখা যাবেনা। যে কাজ সমাজে পুরুষ করতে পারে তা নারীও পারবে। কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বিভাজন সমাজ আর চায়না। নারীরা ও মেনে নিবে না। নারীর উন্নয়নে তাঁর কাজের পথে যারা বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল তাদের জবাব দিয়েছেন এইভাবে, ‘স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে যদি স্বাধীনতা হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি ব্যারিস্টার, লেডি জজ হইব। আমাদের কী হাত নেই, পা নেই, বুদ্ধি নেই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীগৃহ কার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ এ ছাড়াও তিনি বলেছেন, ‘আমরা (নারীরা) যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন-বস্ত্র উপার্জন করুক।’
স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতেই বেগম রোকেয়ার এই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিয়েছিলেন হাজার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই জাতির পিতা একইসাথে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পূনর্গঠন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও উন্নয়ন শুরু করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পূনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালে নারী পুনর্বাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ সমতা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করেন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে সর্বপ্রথম জাতির পিতাই নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত করেন এবং প্রথম সংসদেই নারীরা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গত দশ বছরে বিভিন্ন নীতি, কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। যার ফলে আমাদের দেশে জেন্ডার বৈষম্য যেমন কমেছে তেমনি নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের বৈশ্বিক সূচক ও মাপকাঠিতে বাংলাদেশ অভুতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। আজ বাংলাদেশের নারীরা বিচারক, সচিব, মেজর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর।
বেগম রোকেয়ার দেশের নারীরা সামরিক, বিমান চালনা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা ও শিল্পোদ্যোগসহ সব ক্ষেত্রেই সফলতার সাথে কাজ করছে। নারী শিক্ষা, উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার অর্জনের মাধ্যমে এদেশের নারীরা বেগম রোকেয়ার সকল স্বপ্ন পুরণ করেছে। ৯ ডিসেম্বর সুসাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ-সংস্কারক বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন ও দেশের আলোকিত পাঁচজন নারীকে বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করে থাকে। আদর্শ ও অনুপ্রেরনার উৎস এবং কর্মময় জীবনের অধিকারী মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্মৃতির প্রতি এই দিনে রইল গভীর শ্রদ্ধা।( পিআইডি ফিচার)।