খাদ্য সরবরাহের যে কোন পর্যায়ে অপরাধের শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে খাদ্য শস্যের উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (প্রাক-বিচারিক কার্যক্রম প্রতিরোধ) সংক্রান্ত খসড়া আইন- ২০২২ নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নিয়মিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া মন্ত্রিসভা
সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে যে, পানি প্রবাহ নিশ্চিত রাখার লক্ষ্যে দেশের হাওর অঞ্চলে এলিভেটেড ওয়ে ছাড়া কোন রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনের অধীনে যদি কেউ অপরাধ করে, তবে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, মানসম্মত খাদ্য সামগ্রী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান দুটি আইন- দ্য ফুড গ্রেইনস সাপ্লাই (প্রিভেনশন অব প্রিজুডিসিয়াল অ্যাক্টিভিটি) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ এবং দ্য ফুড স্পেশাল কোর্টস) অ্যাক্ট, ১৯৫৬ যুক্ত করে প্রস্তাবিত আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, খাদ্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণনের কোন পর্যায়ে অপরাধ করার ক্ষেত্রে ও ভুল তথ্য দিলে খসড়া আইনটিতে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়াও মন্ত্রিসভায় আতিয়া ফরেস্ট (সুরক্ষা) আইন, ২০২২ সভায় পেশ করা হয়। তবে, মন্ত্রিসভা ভূমি সংক্রান্ত ডিজিটাল জরিপ সম্পন্ন করার পর এটিকে আবার উত্থাপন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে।
এর আগে ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভা প্রস্তাবিত আইনটি নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বিভিন্ন এলাকার ভূমির ধরন পরিবর্তন হয়েছে বিধায় ডিজিটাল জরিপ জরুরি। অন্যথায়, এতে সমস্যা দেখা দিবে। সভায় অবহিত করা হয়েছে যে, ক্রয় কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর ডিজিটাল জরিপ সম্পন্ন হতে ৩-৪ মাস সময় লাগতে পারে।
আনোয়ারুল ইসলাম আরো বলেন, ১৯২৮ সালে একটি আইনের অধীনে টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলার প্রায় ৫৯ হাজার একর ভূমি সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। আইনটি কার্যকারিতা হারানোর পর সামরিক শাসনামলে আতিয়া ফরেস্ট (সুরক্ষা) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ প্রণয়ন করা হয়।
কেবল হাওরে এলিভেটেড রাস্তা নির্মাণ করা যাবে: মন্ত্রিসভা
মন্ত্রিসভা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে যে, পানি প্রবাহ নিশ্চিত রাখার লক্ষ্যে দেশের হাওর অঞ্চলে এলিভেটেড ওয়ে ছাড়া কোন রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না।
মন্ত্রি পরিষদ সচিব বলেন, অষ্টগ্রাম-মিঠামইন হাওর সড়ক সম্পর্কে মন্ত্রিসভায় হাওর এলাকায় নির্মিত রাস্তার কারণে পানি নামতে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভা জলাবদ্ধতা সমস্যা হলে প্রতি আধা কিলোমিটার দূরত্বে যৌক্তিক ব্যবধান রেখে হাওর সড়কে ১৫০-২০০ মিটার সেতু নির্মাণ করা হলে সমাধান হবে কিনা সে বিষয়ে একটি জরিপ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫ হাজার হেক্টর আবাদী জমি তলিয়ে গিয়ে সফলের ক্ষতি হয়েছে। হাওর এলাকার মোট ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে শস্য আবাদ হয়।
সভায় জানানো হয় যে, আগামী ৩০ এপ্রিল নাগাদ ধান ঘরে তোলা সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। আগামী ৮ থেকে ১০ দিন কোন বৃষ্টিপাত না হলে ফসলের আর কোন ক্ষতি হবে না। বাসস।
হাওরে এলিভেটেড ওয়ে ছাড়া রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না, খাদ্যদ্রব্যে অনিয়ম করলে ৫ বছরের
সব জেলা পরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা, ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন
দেশের সব জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে সরকার। প্রশাসক নিয়োগের আগ পর্যন্ত বিলুপ্ত ৬১ জেলা পরিষদে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পরিচালনার জন্য পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অথবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। রোববার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে উপসচিব মোহাম্মদ তানভীর আজম ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী প্রথম সভার তারিখ থেকে ৫ বছর উত্তীর্ণ হওয়ায় দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের মেয়াদ বিলুপ্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় জেলা পরিষদ আইনের ধারা ৮২ অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসক নিয়োগের আগ পর্যন্ত আইনের ধারা ৭৫-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে প্রত্যেক জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা/ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হলো। জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের ৬১ জেলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি তারা শপথ নেন। ওই বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা পরিষদগুলোর প্রথম বৈঠক হয়। ফলে পরিষদের ৫ বছরের মেয়াদ জানুয়ারি মাসেই শেষ হয়। জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। নির্বাচন না হলে কী হবে, সেটা আইনে উল্লেখ করা ছিলোনা। সংশোধিত আইনে নির্বাচিত নতুন পরিষদ দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
মানবাধিকার রিপোর্টের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার (এইচআর) কান্ট্রি রিপোর্টের অনুসন্ধানের বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের পক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে ঢাকা। কেননা বাংলাদেশ সরকার তাদের রিপোর্টে মৌলিক ত্রুটি লক্ষ্য করেছে।
রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিয়ার আলম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা এখনও তাদের (এখানে মার্কিন দূতাবাস) সঙ্গে কথা বলিনি, তবে শীঘ্রই কথা হবে।’
আলম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে মার্কিন প্রতিবেদনে উল্লেখিত ঘটনার বিষয়ে তথ্য সরবরাহের জন্য অনুরোধ করেছে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার আগে আমরা বিস্তারিত বিষয় নিয়ে কাজ করছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়গুলো দেখভাল করা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো পক্ষ থেকে কোনো হস্তক্ষেপ আশা করে না।’
বাংলাদেশের ওপর ইউএস এইচআর রিপোর্ট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আলম বলেন, রিপোর্টে বেশ কিছু ভুল তথ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবেদনে এলজিবিটিকিউ-এর অধিকারের মতো কিছু বিষয়ে বলা হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সাথে প্রাসঙ্গিক নয় । তিনি আরো বলেন, ‘এগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে, আমরা সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন,তাদের দেয়া ডাটায় ‘মৌলিক কিছু ত্রুটি’ থাকায় তিনি ইউএস এইচআর রিপোর্টের গুণমানের প্রশংসা করতে পারেন না।
আলম বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী হত্যার ঘটনায় হত্যা সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনও চাইবে ঢাকা।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বা বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব।
এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রতিবেদনটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা সম্পর্কে বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে “অবজ্ঞা করেছে। অন্যদিকে, ঢাকা মানবাধিকার রক্ষার জন্য জাতিসংঘ এবং মার্কিন সুপারিশগুলোর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে কাজ করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রতিবেদনটি সমাজ ও সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য অনাচারের সমাজ তৈরি করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের আইনী ব্যবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যার অনুমতি দেয় না।
বিবৃতিতে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় ১৬ র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড এবং কক্সবাজারে মেজর সিনহা হত্যা মামলায় সম্প্রতি দুই পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার নজির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাসস।
প্রতারক সাহেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার বিচার শুরু
দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফ্তার রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় চার্জগঠন করেছেন আদালত। রোববার ঢাকার ১০ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আসামির অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে আগামী ২০ মে মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।
দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর জানান, বিচারক অভিযোগ পড়াকালে সাহেদ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং ন্যায়বিচার চান। এ সময় তার পক্ষে করা অব্যাহতি ও জামিন আবেদন শুনানি নিয়ে নাকচ করেন বিচারক।
অভিযোগ গঠনের পক্ষে বক্তব্য রেখে জামিন আবেদন নাকচের প্রার্থনায় আইনজীবী জাহাঙ্গীর শুনানিতে বলেন, ‘সাহেদ একজন হ্যাবিচুয়াল অফেন্ডার। তার আবেদন নাকচ করা হোক।’
শুনানির সময় সাহেদের আইনজীবীরা কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানের পরিবর্তে বিশেষ গাড়িতে করে আলাদাভাবে তাকে আদালতে আনার আবেদন করলে তা নাকচ করেন বিচারক।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত বছরের ১ মার্চ দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী বাদী হয়ে অবৈধভাবে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে কমিশনের সমন্বিত ঢাকা জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি দুদক আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। করোনার চিকিৎসার নামে প্রতারণাসহ নানা অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে সাহেদের বিরুদ্ধে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহানারা হকের মৃত্যুবার্ষিকী
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের মা বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহানারা হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ১৮ এপ্রিল (সোমবার)। ২০২০ সালের এই দিনে ৮৬ বছর বয়সে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে (অ্যাপোলো হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আইনমন্ত্রীর বাবা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দেশের সংবিধান প্রণেতা কমিটির সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী মরহুম সিরাজুল হক। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেল হত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী। অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর পরলোক গমন করেন।
আইনমন্ত্রীর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তাঁর মায়ের রুহের মাগফিরাত কামনায় সোমবার ঢাকায় এতিমখানায় খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকার কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠন রোববার এবং আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে সোমবার বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহানারা হকের রুহের মাগফিরাত কামনায় ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। রোববার কসবার ইফতার ও দোয়া মাহফিলে আইনমন্ত্রী অংশ নেন। সোমবার আখাউড়ার ইফতার ও দোয়া মাহফিলে তিনি ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন।
চাঞ্চল্যকর শতাধিক খুনের মামলার তদন্তও শেষ হচ্ছে না বিচারও হচ্ছে না
সময় মতো তদন্ত শেষ করতে না পারা, তদন্তকারী কর্মকর্তার ওপর মামলার চাপ, সাক্ষী হাজির করতে না পারা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সারাদেশে শতাধিক চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত খুনের মামলার তদন্ত ও বিচারের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারায় তদন্ত চলে গেছে ডিপফ্রিজে। কোন কোন মামলার ভাগ্য ঝুলে আছে বিচারপ্রক্রিয়ায়। সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে বিলম্বিত হচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়া। ফলে বিনাবিচারে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকছেন আসামিরা। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও সাক্ষী হাজিরে গাফিলতির কারণে বিচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আইনী ফাঁকফোকর গলিয়ে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম ঝুলে আছে বছরের পর বছর। র্যাব, সিআইডি, ডিবি ও থানা পুলিশ চাঞ্চল্যকর এসব হত্যা মামলার তদন্ত করছে। চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের গতি ফেরতে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু তারপরও কিছুতেই কিছুই হচ্ছে না। এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোন কোন খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) পরিবর্তন করা হয়েছে এক ডজনেরও বেশি বার। অথচ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে না । চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার তদন্তেরই যখন এই অবস্থা তখন অন্যান্য খুনের মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের চিত্র আরও করুণ হাল বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্লুলেস খুনের ঘটনাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে বারবার। অনেক খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচনে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে গেছে। আবার কিছু কিছু চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার তদন্ত রহস্যের জালে আটকে দেয়া হয়েছে। কোন কোন ঘটনায় খুনীরা এতই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ধূর্ত যে- খুনের ঘটনা এমনভাবে ঘটানো হয়েছে যে, আসলেই ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) করে রাখা হয়েছে। এসব ক্লুলেস খুনের ঘটনা তদন্তের এক পর্যায়ে এসে হাল ছেড়ে দিয়েছে তদন্ত কর্তৃপক্ষ। আবার এমনও হয়েছে যিনি একটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা তদন্ত করছেন তার কাঁধে আরও অনেক মামলার তদন্তের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে তদন্ত কর্মকর্তা কোনোটারই সঠিকভাবে তদন্ত শেষ করতে পারেন না। একসময় দায়সারাগোছের তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে দেয়া হয়, অনেক ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত চলে যায় ডিপফ্রিজে।
২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ঢাকার লালমাটিয়ার নিজ বাসায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নুরুল ইসলাম ও তার ছেলে তমোহর ইসলাম। কিন্তু এই খুনের ঘটনার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। মীরহাজিরবাগে ২০০৮ সালের নভেম্বরে পরিবহন ব্যবসায়ী জুয়েল হোসেন ও তার বন্ধু পোশাক ব্যবসায়ী মারুফ হোসেন টুটুল খুন হন। রহস্যজনক এ জোড়া খুনের তদন্তে ১০ বার কর্মকর্তা বদল করা হয়। কিন্তু রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। শুধু তাই নয়, গত কয়েক বছরের মধ্যে সাংবাদিক সাগর-রুনী, জাতীয় সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেলে অজ্ঞাত মহিলা হত্যার রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি। চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার তদন্তে বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কিন্তু খুন রহস্যের কোন কূলকিনারা করতে তারা পারছে না তারা। এসব হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তদারকি করা হচ্ছে। র্যাব, সিআইডি, ডিবি ও থানা পুলিশ চাঞ্চল্যকর এসব হত্যা মামলার তদন্ত করছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, যেসব চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- রাজধানীর টিকাটুলির সিক্স মার্ডার, পরিবাগের তুর্কি এ্যাসোসিয়েটস অফিসে রমজান আলী খুন, এ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম বাচ্চু হত্যাকান্ড ঘটনা, মালিবাগে সানরাইজ হোটেলের ভেতর ডিবি ইন্সপেক্টর নুরুল আলম শিকদার ও এসআই আলমগীর হোসেন তালুকদার, পুরান ঢাকার ওয়ার্ড কমিশনার আহম্মদ হোসেন হত্যা, মিরপুরে ব্যবসায়ী আফতাব, প্রিন্স গ্রুপের মালিক কাজী শহিদুল হক, ওয়ার্ড কমিশনার মিস্টার, গুলশানে গৃহবধূ তাসমির হোসেন মুন্নী, পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী আজগর, খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী ইসলাম শিকদার, বিজয়নগরে ব্যবসায়ী নজরুল, সবুজবাগে আজিজুল, মিরপুরে আওয়ামী লীগ নেতা সামাদ খান, মিরপুরে মিসুক সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সান্টু, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মনু, ফকিরাপুলে ব্যবসায়ী সোহেল হোসেন টিটু, তেজগাঁও থানা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ও মিরপুরের কাপড় ব্যবসায়ী আলী আকবর, জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার মহাসচিব ইদ্রিস আলী বেপারি, বাড্ডায় থাই এ্যালুমিনিয়ামের ঠিকাদার আল আমিন, পুরান ঢাকার মহানগর পুস্তক বাঁধাই সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদ, মতিঝিলে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কাউসার আলী, ধানমন্ডির জিগাতলায় বিএনপির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামান শিবলী, মোহাম্মদপুরে আবাসন কোম্পানি শেলটেকের কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ, রমনার ইঞ্জিনিয়ার এসএম শফিক-উল মওলা, রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র হারিসুল ইসলাম বিপ্লব, ধানমন্ডিতে সাবেক শিক্ষিকা কাজী সুহিন নাহার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আফতাব আহমাদ,নারায়ণগঞ্জের তানভির মোহাম্মদ ত্বকি হত্যাকাণ্ড প্রমুখ।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার তদন্ত হিমাগারে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার রাজাবাজারে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী, গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুক, খুলনায় তৈয়েবুর রহমান ও তার ছেলে মনির ও উত্তরায় জঙ্গী সংগঠন থেকে ফিরে আসা ফল ব্যবসায়ী মাসুম হত্যার ঘটনা এবং সাংবাদিক সাগর-রুনী দম্পতির। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর মামলা তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তের ৬২ দিনের মাথায় হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এর পর আদালতের নির্দেশে তদন্ত ভার নেয় র্যাব। তারা ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সাগর-রুনীর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী নিহত দম্পতির শিশুপুত্র মাহী সরওয়ারের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলে র্যাব সদস্যরা। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করে শতাধিক ব্যক্তিকে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সাগর-রুনীর রক্তমাখা জামাকাপড়, বঁটি, মোজাসহ কিছু আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে পাঠানো হয়। অভিজ্ঞ ফরেনসিক আলামত সংগ্রহকারীরা ওই ঘর থেকে আরও কিছু আলামত সংগ্রহ করেন ও ডিএনএসহ আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সাগর-রুনীর লাশ কবর থেকে ওঠানো হয়। এখন শুধু সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের বিষয়ে সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। এখন শুধু সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উচ্চ আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করে র্যাব, আর আদালত সময় দিয়ে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করে দেয়ার এক অনির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করে যাচ্ছে। গত ১০ বছর আগে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের তদন্তের অবস্থা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে, রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, চাঞ্চল্যকর হত্যার মধ্যে কয়েকটি মামলা ঝুলে আছে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। পাঁচ বছরেও হত্যাকাণ্ডের মোটিভই উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি এমন মামলাও আছে। তদন্ত চলছে, শিগগরই অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে, এমন কিছু বক্তব্য দিয়েই পুলিশের তদন্ত সংস্থা দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যেসব হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি তার মধ্যে ২০০৭ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র হারিসুল ইসলাম বিপ্লব, ২০০৫ সালে তেজগাঁওয়ে এ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম বাচ্চু, ধানমন্ডিতে সাবেক শিক্ষিকা কাজী সুহিন নাহার ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আফতাব আহমাদ হত্যাকান্ড, রমনার ইঞ্জিনিয়ার এসএম শফিক-উল মওলা হত্যিকাণ্ড। এসব খুনের ঘটনা এখনও অনুদঘাটিত। এসব মামলার ভবিষ্যত নিয়ে সন্দীহান বাদীরা। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হত্যাকান্ডের মূল আসামিদের বাদ দিয়ে নিরপরাধীদের আসামি করে চার্জশীট দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগও উঠে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু তদন্তেই নয়, নানা সঙ্কটে বিচারও ধীরগতিতে চলছে । বিচারপ্রক্রিয়া গতিশীল করতে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবুও কাজের কাজ হচ্ছে না। দেশের নিম্ন আদালতগুলোয় শত শত চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম আটকে আছে। ফলে বিচারের আগেই দীর্ঘকাল কারাগারে থাকছেন আসামিরা। কেউ কেউ কারাগারে থেকেই মারা গেছেন। বিচারিক আদালতের রায়ের পর অনেকে আবার কনডেম সেলের বদ্ধ ঘরেই কাটাচ্ছেন বছরের পর বছর। উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় ঝুলছে বছরের পর বছর। বিচার শুরু হলেও তা চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। দুবছর করোনার পাশাপাশি, পুলিশ, প্রসিকিউশনের অদক্ষতা, তদন্তে সময়ক্ষেপণ, সাক্ষী হাজিরে গাফিলতি, সাক্ষীর নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় মামলার জট বেঁধে আছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থানায় পুলিশের কাছে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ধাপে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা নিস্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না করতে পারা, বার বার সময় নেয়া, ঠিক সময়ে সাক্ষী হাজির না হওয়া, বাদালত থেকে বার বার তারিখ নেয়া মামলা ঝুলে যাওয়ার বড় কারণ। আইন অনুযায়ী, বিচার বা মামলার তদন্তের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রে সেটি মানা হয়। সাক্ষীর আদালতে হাজির না হওয়ার ঘটনাই বেশি। ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে সাক্ষীরা অনেক সময় আদালতে আসেন না। দেশে সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই। সাক্ষীদের আদালতে আনা-নেয়ার আলাদা কোন ব্যবস্থাও নেই।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক ফৌজদারি মামলার সাক্ষীকে সময়মতো আদালতে হাজির করতে পারছে না পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীর ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে এমসময় আদালতে দায়সারা প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে। সাক্ষী আসেন না বেশিরভাগ খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ধর্ষণসহ হত্যা, অস্ত্র ও ছিনতাই মামলার। ভয়ঙ্কর অপরাধের এসব মামলায় সহজে কেউ আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে চান না। আইন অনুসারে মামলার অভিযোগ গঠনের পর আদালতে সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। সাক্ষ্যগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করবে প্রসিকিউশন। এ দুই পক্ষের কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকার কারণেও সময়মতো সাক্ষ্যগ্রহণ করা যায় না।
রমনা বটমূলে বোমা হামলার মামলায় ফাঁসির আসামী জঙ্গী মুফতি শফিকুর যেভাবে ২১ বছর ধরে আত্মগোপনে ছিলেন
রমনা বটমূলে বোমা হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত মুফতি শফিকুর রহমান ওরফে আব্দুল করিম ওরফে শরীফুর ইসলামের শেষ রক্ষা হলো না। নাম-পরিচয় পরিবর্তন করে দীর্ঘ ২১ বছর আত্মগোপনে থেকে শেষ পর্যন্ত র্যাবের জ্বালে ধরা পড়তে হয়েছে।
শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারস্থ র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় রাব। সংস্থাটির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, চাঞ্চল্যকর সব মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করছে র্যাব। এরই মধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম পলাতক আসামি জঙ্গি ইকবালকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালীন বোমা হামলায় ১০ জন নিহত ও আরও অনেকে আহত হন। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে রমনা থানায় একটি হত্যা মামলাসহ অপর একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।
রমনা বটমূলে বোমা হামলার পর ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মুফতি শফিক আত্মগোপনে থেকে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আব্দুল করিম নাম ধারণ করে ২০০৮ থেকে নরসিংদীর একটি মাদ্রাসায় আত্মগোপন করেন তিনি। নরসিংদীর চর এলাকায় অবস্থিত একটি মসজিদে ইমামতির চাকরি নেন শফিক। ইমামতির আড়ালে তিনি মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে বিভ্রান্তিমূলক অপব্যাখ্যা প্রচার করতেন। কৌশলে মাঝে মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতেন তিনি।
র্যাব জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামীলীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত ও প্রায় তিন শতাধিক গুরুতর আহত হয়। ওই ঘটনায় ঢাকার মতিঝিল থানায় একটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার সহযোগিতাসহ দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মুফতি শফিকুর রহমান ওরফে আব্দুল করিম ওরফে শরীফুর ইসলামসহ (৬১) আরও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। গ্রেফতার শফিকুর রহমান ওই গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। একই ঘটনায় ঢাকার মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা অপর মামলারও পলাতক আসামি ছিল শফিক। এছাড়াও ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানার বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত এবং কমপক্ষে শতাধিক লোক আহত হয়। ওই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার শফিকুর কিবরিয়া হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি।
শফিকুর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবকে জানিয়েছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের নিজ গ্রামে ৫ম শ্রেণি পাস করার পর মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা চকবাজারের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন । এরপর ১৯৮৩ সালে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পাস করে বাংলাদেশে ফেরত আসেন তিনি। এরপর ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে ইউসুফ বিন নুরী মাদ্রাসায় ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হয়ে তিন বছরের ইফতা (ফতোয়া) কোর্স সম্পন্ন করেন শফিক। করাচির নিউ টাউনে পড়াশোনা করার সময় মুফতি হান্নানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানে অবস্থানকালীন মুফতি শফিক আফগানিস্তানে চলে যান এবং তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। সেখানে থাকাকালীন জঙ্গী সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে আসার পর তিনি ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি মাদ্রাসায় পার্ট টাইম শিক্ষকতা শুরু করেন।
র্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, আফগানিস্তান থেকে দেশে এসে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) নামে একটি জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা করেন মুফতি শফিক। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে দেশে ফিরে এসে সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে হুজিবি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত হুজিবির প্রচার সম্পাদক ছিলেন মুফতি শফিকুর রহমান ওরফে আব্দুল করিম ওরফে শরীফুর ইসলাম। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হুজিবির আমীর ও ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত হুজিবির সুরা সদস্য ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সড়ক থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এক মাত্র ছেলের সঙ্গে তিনি গোপনে যোগাযোগ রাখতেন। শফিকুরের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় মোট ছয়টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর পলাতক থাকায় এখন আইন অনুযায়ী তার সাজা কার্যকর হবে।
স্ত্রীর শারীরিক চাহিদা মেটাতে জেলবন্দিকে ১৫ দিনের প্যারোলে মুক্তি দিলো আদালত
স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটাতে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এক জেলবন্দিকে প্যারোলে ১৫ দিনের মুক্তি দিয়েছে ভারতের একটি হাইকোর্ট। এই বন্দির স্ত্রী তার শারীরিক চাহিদা ও গর্ভবতী হওয়ার দাবিতে যোধপুর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করলে আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করেন। মানবিক দৃষ্টি বিবেচনা করে আদালত বলেছে, স্বামী জেলবন্দি বলে তো স্ত্রীকে তার শারীরিক ও মানসিক চাহিদার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না! আবার অপরাধীকে পুরোপুরি ছেড়েও দেয়া যায় না। অগত্যা স্ত্রীর চাহিদা পূরণের জন্য জেলবন্দি অপরাধীকে ১৫ দিনের প্যারোলে মুক্তির নির্দেশ দেয় যোধপুর হাই কোর্ট।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, নন্দলাল নামের ওই ব্যক্তি এক ঘৃণ্য অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। রাজস্থানের ভিলওয়ারার এক আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার কঠোর বন্দিদশা নিয়ে চরম অসন্তুষ্ট স্ত্রী। যোধপুর আদালতে তিনি এক আবেদন করে জানান, “আমি গর্ভবতী হতে চাই, আমার গর্ভবতী হওয়ার অধিকার আছে। তাই স্বামীকে মুক্তি দিতে হবে।” মহিলার সেই আবেদনের ভিত্তিতেই শেষপর্যন্ত নন্দলালকে ১৫ দিনের প্যারোলে মুক্তি দিতে বাধ্য হল যোধপুর আদালত।
যোধপুর আদালতের ডিভিশন বেঞ্চের দুই বিচারপতি সন্দীপ মেহেতা এবং ফারজাদ আলি মেনে নিয়েছেন যে, নন্দলাল জেলবন্দি থাকার জেরে তাঁর স্ত্রী মানসিক এবং শারীরিক সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া ভারতের সংবিধান ‘বংশরক্ষার অধিকার’কে স্বীকৃতি দেয়। শুধু তাই নয়, হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন সব ধর্মেই বংশরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাই ওই মহিলাকেও বংশরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়নি যোধপুর হাই কোর্ট।
তাছাড়া, নন্দলাল যাতে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেটাও নিশ্চিত করতে চান দুই বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। তাই সবদিক বিচার-বিবেচনা করেই ওই ব্যক্তির ১৫ দিনের জন্য প্যারোলের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত। এর আগে ২০২১ সালে একবার বিশ দিনের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল তাকে। সেসময় প্যারোলের সব শর্ত পূরণ করে ওই বন্দি। সেটাও এবার তার পক্ষে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করলো বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। বলেছে, এটা ‘গৎবাঁধা রিপোর্ট’। “বাংলাদেশের সরকারবিরোধী যে প্রপাগান্ডা মেশিনগুলো আছে, সেসব মেশিন থেকে, তথ্যগুলো প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে,” বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সাংবাদিকদের বলেছে, তাদের রিপোর্ট বস্তুনিষ্ঠ, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও ন্যায্য।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানবাধিকার চর্চা বিষয়ে ২০২১ সালের দেশভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায়, একটি আবশ্যক বার্ষিক প্রতিবেদন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মানবাধিকারকে তার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। এই অধিকার সর্বজনীন: কার জন্ম কোথায়, কার বিশ্বাস কী, কে কাকে ভালোবাসে বা কার কী বৈশিষ্ট্য সেগুলো নির্বিশেষে সকল মানুষ এই অধিকারের দাবীদার।
মঙ্গলবার রাতে ৭৪ পৃষ্ঠার এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়- বাংলাদেশের সংবিধানে একটি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধিকাংশ ক্ষমতাকে একীভূত করে। ডিসেম্বর, ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ, টানা তৃতীয় মেয়াদে জয়লাভ করে; যা তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদে বহাল রাখে। ব্যালট-বাক্স ভর্তি এবং বিরোধী পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানোসহ অনিয়মের কারণে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দ্বারা অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মতো সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলি অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখে। নিরাপত্তা বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করে এবং সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করে। বেসামরিক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলির মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বেআইনি বা নির্বিচারে হত্যা, জোরপূর্বক অন্তর্ধান, সরকারের পক্ষ থেকে, সরকার বা তার এজেন্টদের দ্বারা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি, নির্যাতন বা মামলা, কঠোর এবং জীবন-হুমকি, কারাগারের অবস্থা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার বা আটক, রাজনৈতিক বন্দী, অন্য দেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিশোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যা, গোপনীয়তার সাথে স্বেচ্ছাচারী বা বেআইনী হস্তক্ষেপ, একজন ব্যক্তির অভিযুক্ত অপরাধের জন্য পরিবারের সদস্যদের শাস্তি, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকি, সাংবাদিকদের অযৌক্তিক গ্রেপ্তার বা বিচার, সেন্সরশিপ এবং অপরাধমূলক মানহানি এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং মিডিয়ার ওপর গুরুতর বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট স্বাধীনতার ওপর গুরুতর নিষেধাজ্ঞা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং সমিতির স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপ, যার মধ্যে সংগঠন, তহবিল বা বেসরকারি সংস্থা এবং সুশীল সমাজ সংস্থাগুলির পরিচালনার ওপর অত্যধিক সীমাবদ্ধ আইনসহ, শরণার্থীদের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, উদ্বাস্তুদের সাথে দুর্ব্যবহার, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণের ওপর গুরুতর এবং অযৌক্তিক বিধিনিষেধ, গুরুতর সরকারি দুর্নীতি।
এ ছাড়াও উল্লেখ রয়েছে, গার্হস্থ্য মানবাধিকার সংস্থাগুলির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা হয়রানি, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতায় তদন্তের অভাব এবং জবাবদিহিতার অভাব, যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ, সহিংসতায় জড়িত অপরাধ বা জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের লক্ষ্য করে সহিংসতার হুমকি, সহিংসতায় জড়িত অপরাধ, লেসবিয়ান, গে, উভকামী, ট্রান্সজেন্ডার, কুইয়ার, বা ইন্টারসেক্সচুয়াল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সম্মতিমূলক সমলিঙ্গের যৌন আচরণকে অপরাধী করে এমন আইনের অস্তিত্ব বা ব্যবহার, স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ এবং শিশুশ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপের অস্তিত্ব বিষয়ক বিভিন্ন দিক।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দায়মুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, “র্যাব’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আসার পর আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক নথি শেয়ার করেছি। আমরা এক সময় এসব নথি দিতাম না। গত তিন বছরে কতজন পুলিশ, কতজন র্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সে তথ্যও দিয়েছি। কিন্তু, রিপোর্টে বলা হয়েছে দু’-একটি ক্ষেত্রে। ১৯০ জনকে যেখানে চাকরিচ্যুত করা হয় সেখানে দু’-একটি ঘটনার মধ্যে এটা পড়ে না।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার ইতিহাসও এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে রাজনৈতিক বন্দী বলা হয়েছে। তিনি তো রাজনৈতিক বন্দি নন। তাকে মানবিক কারণে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে বাসায় থাকতে দেয়া হয়েছে। তার বিদেশ যাওয়ার প্রশ্নটাও ছিল অমূলক।”
শাহরিয়ার আলমের দাবি, রোহিঙ্গাদের বিষয়েও রিপোর্টে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা সরকার কতটা মানবিক, কতটা আন্তরিক সেটা সবার জানা। এরমধ্যে, পৃথিবীর কেউ যদি রোহিঙ্গা প্রশ্নে মানবিকতা শেখাতে আসে, তখন আমার মনে হয় তাদের ‘নৈতিক স্খলন’ হয়েছে। আমরা রিফিউজি ট্রিটি সিগনেটরি নই। তারপরও আমরা এসব প্রটোকল মেনে চলেছি।”
সমকামীদের জন্য বাংলাদেশে আইন নেই, প্রতিবেদনের এই অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহরিয়ার আলম বলেন, “এটা আমাদের ইসলাম ধর্মের পরিপন্থি। পৃথিবীর এমন একটা মুসলিম দেশ দেখান, যারা সমকামিতাকে অনুমোদন দেয়।”
শাহরিয়ার আলম জানান, আগামী রোববার এই রিপোর্টের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাবে সরকার।
অন্যান্য প্রতিক্রিয়া
ওদিকে, বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এই রিপোর্টে তথ্যের গরমিল রয়েছে। বিচার বিভাগ ব্যবহার করে রাজনৈতিক হয়রানি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিচার বিভাগ স্বাধীন। হয়রানি হবে কীভাবে? গুম খুনের ব্যাপারেও আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি। অনেকে আত্মগোপন করে গুম বলে চালিয়ে দিচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী অনেককে খুঁজে বের করে এনেছে। “
বিএনপি বাংলাদেশে মানবাধিকার চর্চার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের প্রশংসা করেছে। দলটি বলেছে, এই প্রতিবেদনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অপকর্ম এবং ‘চরম দুঃশাসন’ তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ সরকারের হাতে থাকা অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজা দেয়া হয়েছে এবং দেশের নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।”
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, বিরোধীদের নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে।…আমি বলতে চাই, এই প্রতিবেদনে আওয়ামী সরকারের অপকর্ম প্রকাশ পেয়েছে।”
আরো কী আছে যুক্তরাষ্টের প্রতিবেদনে
মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ
মানবাধিকার বিষয়ক এই রিপোর্টে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলা হয়, এখানে অনলাইন এবং অফলাইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমাবদ্ধ। মিডিয়ার সদস্যরা এবং ব্লগাররা নিজেরাই ভয়ে নিজেদের বক্তব্যকে সেন্সর করেন। সংবিধানের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের সমান অপরাধ করা হয়েছে। এই আইনে ‘ঘৃণামূলক’ বক্তব্যকে সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু সংজ্ঞায়িত করা হয়নি ঘৃণামূলক বক্তব্য কোনটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যাবজ্জীবন পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে ৪৩৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে অনলাইনে আক্রমণাত্মক ও মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে। এডিটরস কাউন্সিলের বরাতে এই রিপোর্টে বলা হয়, এই আইনের ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য। মুক্তমনা লেখক মুশতাক আহমেদ তার জীবন দিয়ে এটা প্রমাণ করে গেছেন। ২০২০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রেস রিলিজে বলা হয়, দেশের ভেতরে এবং বিদেশে বসে সরকার, জনপ্রতিনিধি, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও প্ররোচনামূলক বিবৃতির ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ দেয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে হিন্দু ও বৌদ্ধদের সম্পদ ও মন্দিরের ওপর হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব ধর্মীয় বিশ্বাসের গ্রুপগুলোর কেউ কেউ বলেছেন, করোনা মহামারির সময়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেটে একটি হিন্দু গ্রামে প্রায় ৮০টি বাড়ি ও ৮টি মন্দির ভাঙচুর করা হয়। এর জন্য মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ হেফাজতে ইসলামের শত শত সদস্যকে দায়ী করে। যদিও সংগঠনটি হামলার দায় অস্বীকার করে।
রিপোর্টে বলা হয়, এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আছে সহিংস অপরাধ ও হুমকি। সমকামিতাকে ক্রিমিনালাইজ করার আইন বিদ্যমান রয়েছে।
মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়, লিঙ্গ সমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার সবসময় সংবিধান অনুসরণ করে না। পরিবারে পুরুষের সমান আইনগত মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করতে পারেন না নারীরা। তারা সম্পদেও সমঅধিকার পান না। ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনে, মেয়েরা এখনও ছেলেদের তুলনায় অর্ধেক সম্পত্তির মালিক হন। হিন্দু আইন অনুযায়ী, একজন নারীর স্বামী মারা গেলে, স্বামীর সম্পত্তিতে ওই বিধবার অধিকার থাকে সীমিত।
রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড
প্রতিবেদনে বলাহয়, সংবিধানে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কথা বলা রয়েছে। তবে, সরকার বা তার এজেন্টরা সেসব ভুলে, স্বেচ্ছাচারিতা করছে বা বেআইনি হত্যা করছে । গুরুতর শারীরিক আঘাত বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে, পুলিশের দ্বারা অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু সরকার মৃতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে না বা নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা হত্যার অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, নাগরিকরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই ধরনের মৃত্যুতে তাদের ভূমিকার কথা নিরাপত্তাবাহিনী প্রায়ই অস্বীকার করে। সরকার সাধারণত এই মৃত্যুকে “ক্রসফায়ার হত্যা,” অথবা “এনকাউন্টার হত্যা” বলে উল্লেখ করে আসছে। মিডিয়াও এই পদগুলি ব্যবহার করে। দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) একটি তথ্য দিয়ে বলেছে যে , ৮০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে মারা গেছে, যার মধ্যে ৫১ জন তথাকথিত ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ডের শিকার। ২০১৮- র মে থেকে জুনের মধ্যে , আইন ও সালিশ কেন্দ্র বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ডের মোট ৬০৬ টি ঘটনা রিপোর্ট করেছে।
আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ৩৫ জন মারা গেছে। আইন প্রয়োগকারীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধের ফলে ৩০জন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন এবং আরও ছয়জন হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের জেরে মারা যান।
২০২০ সালে অধিকার মোট ২২৫টি বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ড রিপোর্ট করেছে, ২০১৯ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ৩৯১। মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজ, কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে, স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা এবং মিডিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ১০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের খবর সামনে এনেছে।
প্রসঙ্গ রোহিঙ্গা শরণার্থী
মিয়ানমারের বর্বরতা থেকে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অস্থায়ী আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবাধিকার রিপোর্টে। রিফিউজি কনভেনশনের সিগনেটরি না হওয়ায়, তাদের শরণার্থীর মর্যাদা না দেয়ার কড়া সমালোচনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একইসঙ্গে বাস্তুচ্যুতদের, দ্বীপ এলাকা ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে, রিপোর্টে ভাসানচরকে সাগরের মধ্যবর্তী একটি জেলখানা বলে তীর্যক মন্তব্য করা হয়। অভিযোগ করা হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দাতা সম্প্রদায়কে ভাসানচর সম্পর্কে সরকারি প্রতিনিধিরা বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করেন। কিছু শরণার্থীকে সম্মতি ছাড়াই স্থানান্তরে বাধ্য করা হয়েছে এমন অভিযোগও তোলা হয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টে এ-ও বলা হয়, রোহিঙ্গারা এটা স্বীকার করেন যে, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর তুলনায় ভাসানচর উন্নত। তবে, সেখানে রয়েছে খাদ্য ঘাটতি, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা তথা চলাফেরার স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ। আর, জীবিকার সুযোগ কম।
রোহিঙ্গারা চাইলেই কক্সবাজার ক্যাম্পে থাকা স্বজনদের সঙ্গে দেখার অনুমতি পান না; এমন দাবি করে রিপোর্টে বলা হয়, দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে, তাদের প্রায়শই মারধর খেতে হয়। এমনকি কম্পাউন্ডের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে; যা যুক্তরাষ্ট্র স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত করতে পারে নি। ভাসানচর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় নারী ও শিশুসহ ৪০ থেকে ৪৫ রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকা ডুবে যাওয়া এবং ১১জন রোহিঙ্গা মারা যাওয়ার বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গুম প্রসঙ্গ
মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং মিডিয়া গুম ও অপহরণের একাধিক খবর প্রকাশ্যে এনেছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে, ১৮ জন ব্যক্তিকে বলপূর্বক গুম করা হয়েছে। সরকার বিষয়টি প্রতিরোধে সীমিত প্রচেষ্টা করছে। সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো জানাচ্ছে, বলপূর্বক গুম করা মানুষদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বিরোধী নেতা, কর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বী।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, পুলিশ বাহিনী অন্তর্ধান হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবার থেকে কোনো অভিযোগ নিচ্ছে না। সুশীল সমাজ সংগঠন ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময়ে, ইসলাম প্রচারক আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান, মাদ্রাসার বেশ কিছু ছাত্র এবং হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত অনেকে নিখোঁজ। এখনো তাদের বেশিরভাগের সম্পর্কে কোনো খোঁজ মেলেনি। যাদের খোঁজ মিলেছে তাদের মিথ্যা অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে
আগস্টে, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বর্ণনা করেছে যে, বলপূর্বক গুম করার বিষয়টি ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা ব্যবহৃত কৌশলে পরিণত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (ডব্লিউজিইআইডি) বাংলাদেশে নিখোঁজের একাধিক অভিযোগ এবং সরকারের দায়মুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
নির্যাতন এবং অমানবিক আচরণ
সংবিধান ও আইনে নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ নিষিদ্ধ করা তা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং মিডিয়ার রিপোর্ট বলছে, দেশের পুলিশ এবং নিরাপত্তাবাহিনী আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটিসহ (CAT) একাধিক সংস্থার মতে , নিরাপত্তা বাহিনী অভিযুক্তদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্যাতনকে হাতিয়ার বানিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- লোহার রড দিয়ে মারধর, বৈদ্যুতিক শক, ধর্ষণ , অন্যান্য যৌন নির্যাতন এবংমৃত্যুদণ্ড।
৪ জানুয়ারি গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার চারদিন পর বরিশালে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয় রেজাউল করিম রেজার। মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে, রেজা নামে একজন আইনের ছাত্র অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছেন এবং তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক মুশতাক আহমেদ কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। ট্রায়ালের আগে তাকে ১০ মাসের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল। ৪ মার্চ, ডিএসএ-এর অধীনে অভিযুক্ত আহমেদ কবির কিশোর জামিনে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর কিশোরকে দৃশ্যত আহত অবস্থায় দেখা গেছে। হেফাজতে থাকাকালীন তার ওপর অকথ্য নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে ১০ মার্চ কিশোর ঢাকার একটি আদালতে মামলা দায়ের করেন । এখানেই শেষ নয়, ভারতীয় বন্দি শাহজাহান বিলাশের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের পর, ঘটনার ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। পরে, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঁচ কর্মকর্তাসহ প্রধান কারারক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়।
বৈষম্য এবং সামাজিক নির্যাতন
ধর্ষণ এবং গার্হস্থ্য সহিংসতা: আইনে শুধুমাত্র নারীদের ধর্ষণ নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা আছে। ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে অথবা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু, স্বামী যদি স্ত্রীকে ধর্ষণ করে বা বৈবাহিক ধর্ষণকে আইন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি দেখেছে যে, ধর্ষণ একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে বাংলাদেশে। দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার গ্রুপ আইন ও সালিশ কেন্দ্র অন্তত ১,৩২১ টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করেছে।
অধিকার -এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালে, ১৫৩৮ জন নারী এবং শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয়, ধর্ষকদের দ্বারা নির্যাতিতাদের ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ ছিল। ধর্ষণের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার হুমকি দিয়েছিল অভিযুক্তরা। অধিকার গোষ্ঠীগুলি জানিয়েছে যে, মহামারির সময়ে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সর্বত্র বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র রিপোর্ট করেছে যে, ৬৪০ জন নারী গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং সহিংসতার ফলে মারা গেছেন ৩৭২ জন।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটে একটি গণধর্ষণ মামলার প্রতিক্রিয়ায় নারীবাদীরা লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি স্থানীয় গ্রুপ চালু করে, যার নাম “ধর্ষণের বিরুদ্ধে ক্রোধ” বা “Rage Against Rape,”। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয় এই আন্দোলন থেকে।
আইন অনুযায়ী ধর্ষণের মামলা পরিচালনার জন্য একজন পুলিশ অফিসারকে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য রেকর্ড করতে হবে। রাসায়নিক এবং ডিএনএ পরীক্ষা অবশ্যই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করাতে হবে। স্টেশনে অবশ্যই একজন নারী পুলিশ অফিসার থাকতে হবে, যিনি ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করবেন। নির্যাতিতাকে; একজন আইনজীবী, সমাজকর্মী বা অন্য কোন ব্যক্তি; যাকে তিনি উপযুক্ত বলে মনে করেন, তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। প্রয়োজনে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাও থাকতে হবে নির্যাতিতাকে সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক ধর্ষিতা আইনি সহায়তার অভাবের কারণে, ধর্ষণের অভিযোগ রিপোর্ট করেননি, সেইসঙ্গে তাদের মনে যথাযথ পরিষেবা পাওয়া নিয়ে সংশয়, সামাজিক কলঙ্ক ও হয়রানির ভয়ও ছিল। ভয়েস অফ আমেরিকা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেসরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ
কেয়াফুরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শোইফ যখন নবম শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপছিলেন তখন সশস্ত্র পুলিশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি স্কুলে তার অফিসে অভিযান চালায়। গত বছর নিহত একজন রোহিঙ্গা নেতা ২০১৯ সালে এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পুলিশের বন্ধ করে দেয়া বা ডিসেম্বর থেকে পুলিশের বাধার মুখে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় ৩০টি স্কুলের মধ্যে এটি সর্বসাম্প্রতিক ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দাবি করেছে, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শনাক্তকরণ নথি বাজেয়াপ্ত করার এবং স্কুলগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে তাদের জোরপূর্বক একটি প্রত্যন্ত, বন্যাপ্রবণ দ্বীপে স্থানান্তর করার হুমকি দিয়েছে।
নিজেদের পক্ষে কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা শুধু “অবৈধ স্থাপনা”-র কার্যক্রম বন্ধ করেছে। ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ দৌজা বলেছেন, কেয়াফুরি স্কুলটি পরিচালনার অনুমতি ছিল না এবং এর কিছু শিক্ষক সরকারি ভাষা বাংলা পড়াচ্ছিলেন যা রোহিঙ্গাদের বাঙালিদের সাথে মিশে যাওয়া ও বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে অবস্থান করা থেকে বিরত রাখতে সরকার তার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে। দৌজা বলেন, ইউনিসেফ রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাদানে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরে হাজার হাজার শিক্ষাকেন্দ্র ও স্কুল পরিচালনা করছে। রোহিঙ্গা এডভোকেসি গ্রুপ “আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস”-এর নেতা আবদুর রহিম ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী অর্থাৎ স্কুল যাওয়ার উপযুক্ত বয়সের হাজার হাজার শিশুর জন্য শিবিরের অভ্যন্তরে কোনো শিক্ষার সুবিধা নেই।তিনি বলেন, “তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।” ছবি ও খবর-ভয়েস অফ আমেরিকা।










