ঢাকা   , ,     

Home Blog Page 8

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা, নাকি ভূরাজনৈতিক ফাঁদ?

0

বিশেষ প্রতিনিধি: মক্কা প্যাক্ট এখন বার্নিং ইস্যু হিসেবে সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। হঠাৎ তিনটি দেশ একটি সামরিক জোটে এক হলো কেন এ নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। এর পরিস্ফুটন ঘটার আগেই বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহল বেশ উদ্বিগ্ন বলে আভাস মিলছে।
​গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর কৌশলগত, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবগুলো সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর গত সোমবার এ জোটে যোগ দিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা প্রকাশ করার পর বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এ মন্তব্যগুলো এলো।
সাবেক কূটনীতিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো সিদ্ধান্তই যেন প্রধান প্রধান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার যে দীর্ঘদিনের নীতি বাংলাদেশের রয়েছে তা ক্ষুণ্ন না করে, অথবা দেশকে তার জাতীয় স্বার্থের বাইরের কোনো দ্বন্দ্বে টেনে না নেয়।
কোনো দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে, সেখানে শুধু তাৎক্ষণিক কৌশলগত লাভ নয়—সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনই আলোচনার পর্যায়ে আসেনি। তাঁর বক্তব্য, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানকে এই জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে, যেখানে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের কাছে আদৌ কোনো আমন্ত্রণ এসেছে কি না, সেটিই আগে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমন্ত্রণ এলে তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি ন্যাটো (NATO) চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। তবে এই চুক্তির অধীনে ন্যাটোর মতো কোনো একক কমান্ড কাঠামো থাকবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন স্বাধীন গবেষক আলতাফ পারভেজ। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বাংলাদেশকেও এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করতে পারে।
আলতাফ পারভেজের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাতের পর ইরান ও তেহরানের নেতৃত্ব মুসলিম বিশ্বে একটি শক্তিশালী ও দৃঢ় ভাবমূর্তি অর্জন করেছে। এর ফলে সৌদি আরব ও তুরস্ক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় আরও সক্রিয় হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমর্থন উভয় দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গত দুই-তিন বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে তুরস্কের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান যুদ্ধ বিভিন্ন দেশকে তাদের প্রতিরক্ষা নীতি নতুন করে পর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে সামনে এসেছে। তাঁদের দৃষ্টিতে মক্কা চুক্তি সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য বহিঃপ্রকাশ।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।
তিনি উল্লেখ করেন, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত ও কাতারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলো এই চুক্তিতে যোগ দেয়নি। অথচ সাধারণ কোনো সীমান্ত না থাকা তিনটি দেশ কেন এমন একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হলো, বাংলাদেশের জন্য সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
ইশফাক ইলাহী চৌধুরীর বিশ্লেষণে, পাকিস্তান বর্তমানে আফগানিস্তান ও ভারত সীমান্তে নানা ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখওয়া ও বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিও জটিল। এর পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি বিশাল সামরিক কাঠামো ও জনবলের ব্যয় বহন করতে চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে রয়েছে। তুরস্কও কুর্দি ইস্যু এবং গ্রিসের সঙ্গে সাইপ্রাস-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন হলো—যেসব কারণে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রয়োজন অনুভব করছে, বাংলাদেশ কি একই ধরনের নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কারণে এমন একটি জোটে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটা—সেটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
ইশফাক ইলাহী চৌধুরী আরও সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ এ ধরনের চুক্তিতে যোগ দিলে ইরান ও তার মিত্রদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি আমদানি এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয় রয়েছে। ফলে কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না; এর সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সংকট সমাধানে বাস্তব কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে কি না। এই প্রশ্নটিও সামনে এনেছেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।
অন্যদিকে আলতাফ পারভেজ মনে করেন, চুক্তিটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্ব পুঁজিবাদ ও বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েল হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলা এই অঞ্চলের সম্পদ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে নিরাপদ রাখার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
তাই মক্কা চুক্তিকে কেবল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পারস্পরিক নিরাপত্তা সমঝোতা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এই জোটে যুক্ত হওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে, তার আগে চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, স্বাক্ষরকারী দেশগুলো কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ফলাফল কী হতে পারে—এসব বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
আলতাফ পারভেজ আরও মনে করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক চুক্তি ও জোটের বিস্তার শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো ছোট দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করতে থাকা এসব দেশের জন্য বড় শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদও মক্কা চুক্তির পেছনের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি গভীরভাবে পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সামরিক সক্ষমতা ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশের কী লাভ এবং কী ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
তিনি সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীদার ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন কেন দেখা দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে—সেটিও জনগণের কাছে পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রের এমন কোনো সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব বহন করতে হয় পুরো জনগোষ্ঠীকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যক্তির একটি ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো একটি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কবার্তা—যুদ্ধের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায় যারই হোক, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। যুদ্ধের আগুনে ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ জনপদ ধ্বংস হয়েছে, অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি ও অবকাঠামো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই দেশের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক জোটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে এমন কোনো চুক্তি যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায় এবং তার ফলে কোনো দেশ বা জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না—এটি কেবল একটি কূটনৈতিক বা সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই আবেগ বা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত, জাতীয় স্বার্থ এবং সর্বোপরি জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

কোচিং বাণিজ্যে বিচারকরা অংশ নিতে পারবেন না, নিষেধাজ্ঞা সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের

0

 

বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত সরাসরি কিংবা অনলাইন কোচিং কার্যক্রমে বিচার বিভাগীয় কোনো কর্মকর্তা অংশ নিতে পারবেন না। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের (বিচারক) এ ধরনের সম্পৃক্ততায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। একই সঙ্গে কোচিংয়ের প্রচারে বিচারকদের নাম, পদবি, ছবি ও পরিচয় ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক কোচিংয়ের জন্য শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, প্রকাশ বা সরবরাহেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচার শাখা থেকে এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হয়। প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে জারি করা পরিপত্রটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীর সই করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের সদস্যদের পেশাগত শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের সুদৃঢ় আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, জুডিশিয়াল সার্ভিসের কোনো সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত সরাসরি কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কোচিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না।
পরিপত্রে আরও বলা হয়, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোচিংয়ের প্রচার-প্রচারণায় কোনো বিচারকের নাম, পদবি, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করা যাবে না। কোনো বিচারকও এ ধরনের ব্যবহার অনুমোদন করতে পারবেন না।
বিচারিক দায়িত্ব পালনের সুবাদে পাওয়া গোপনীয়, অপ্রকাশিত বা দাফতরিক তথ্য কোচিং কার্যক্রমে প্রকাশ, সরবরাহ বা ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক কোচিংয়ের জন্য শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত, সম্পাদনা, প্রকাশ বা সরবরাহ করতে পারবেন না জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা।
এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের নীতি জটিলতায় তিন বছরেও চালু হতে পারেনি ৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে স্টিল কারখানা, বাড়ছে লোকসান

0

ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি হিংসা ও লোভের কারণে দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলেন। এমনই এক ঘটনার শিকার হয়েছে একটি স্টিল মিলস।
খবরে জানা গেছে, রোষানলে পড়ে একটি স্টিল মিলস উৎপাদনে যাওয়ার আগেই প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে। ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে বিনিয়োগ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বন্দরে এসেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আমদানি করা যন্ত্রপাতি। ২৭৫ কনটেইনারে থাকা সেই যন্ত্রপাতি কারখানায় পৌঁছানোর আগেই আটকে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। এর মধ্যে জমেছে বন্দর ও শিপিং ড্যামেজ, বেড়েছে ব্যাংকঋণের সুদ, বেড়েছে ডলারের মূল্য এবং প্রকল্প ব্যয়।
এটি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিএমএসআইএল) মেগা স্টিল প্রকল্প। বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে গড়ে ওঠার কথা এই কারখানাটির। প্রকল্পটি চালু হলে সরাসরি প্রায় সাত হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালে কমিশনিং তো দূরের কথা, ২০২৬ সালের আগস্টও প্রায় শেষ। এখন আশা করা হচ্ছে, সব জটিলতা কাটিয়ে কাজ এগোলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারখানাটি উৎপাদনে যেতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর বিএমএসআইএলকে এই স্টিল কারখানা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়কে সামনে রেখে প্রকল্পটির নকশা করা হয়। লক্ষ্য ছিল উচ্চমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমানো।
ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য ওই সময় কয়েকটি ব্যাংকের সিন্ডিকেটেড টার্ম লোনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ২৭৫ কনটেইনারে করে দেশে আসে।
কিন্তু যন্ত্রপাতি আসার পরই তৈরি হয় নতুন জটিলতা। বিএমএসআইএল সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নির্দেশনার কারণে বসুন্ধরা নামধারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একই ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করে এলসির ডকুমেন্ট আটকে দেওয়া হয়। ফলে বন্দরে পড়ে থাকে একের পর এক কনটেইনার।
কনটেইনারগুলো পড়ে থাকার কারণে শুধু বন্দর ও শিপিং-সংক্রান্ত ড্যামারেজই বাড়তে বাড়তে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। অর্থাৎ যন্ত্রপাতির আমদানি মূল্য যেখানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, সেখানে পরবর্তী সময়ে শুধু ড্যামারেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ই তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়।
প্রকল্পটির আর্থিক সংকটের শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০২২ সালে যখন এলসিগুলো খোলা হয়, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ডলারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটে।
ব্যাংকগুলো ২০২২-২৩ সালের মধ্যেই বিদেশি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করে। তবে ৩৬০ দিনের পেমেন্ট সুবিধা থাকায় তখন বিএমএসআইএলের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়নি। ২০২৪ সালের শুরুতে এসে ব্যাংকগুলো বিএমএসআইএলের কাছে এককালীন প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা দাবি করে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়। বিএমএসআইএল এই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করলেও ডকুমেন্ট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো পরে আপত্তি জানায় বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি।
তাঁদের বক্তব্য, ওই সময় ডকুমেন্ট হস্তান্তর করা হলে কনটেইনারগুলো কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে যন্ত্রপাতি কারখানায় নেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রকল্পটি আরও পিছিয়ে যায়।
বিএমএসআইএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এলসিগুলো কাঁচামালের জন্য নয়, ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য খোলা হয়েছিল। তাঁর মতে, কাঁচামাল আমদানি করে কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে দায় পরিশোধ করা সম্ভব হলেও একটি রোলিং মিলের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি বলেন, এটি ছিল একটি প্রি-রেভিনিউ প্রকল্প। তাই এ ধরনের চার্জ আরোপ প্রচলিত প্রকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাঁর দাবি, পরবর্তী ১৩ মাসে যে ড্যামারেজ জমেছে, তা মুদ্রার অবমূল্যায়ন বা বিএমএসআইএলের কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে হয়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যাংকের দাবি করা অর্থের ব্যবস্থা করার পরও ডকুমেন্ট না পাওয়ায় কনটেইনারগুলো ছাড়ানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই বন্দর ও শিপিং ড্যামেজ প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে ঋণের সুদও বাড়তে থাকে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে অগ্রণী ব্যাংককে বিএমএসআইএলকে ওই নির্দেশনা থেকে পৃথকভাবে বিবেচনার কথা জানানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে তত দিনে প্রকল্পটির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়ে গেছে।


প্রকল্পটির অর্থায়নে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। এতে অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও এসবিএসি রয়েছে।
এই কনসোর্টিয়াম মোট ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করে। এর মধ্যে ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ঋণের ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা এখনো ব্যাংকগুলোর কাছেই রয়েছে।
৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির সুদ ও আবগারি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিন্ডিকেটেড ঋণের বিতরণকৃত অংশের ওপর ২৪৬ কোটি এবং ‘ফোর্সড লোনের’ ওপর ৬১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ব্যয় এখনো বাড়ছে।
বিএমএসআইএল এ পর্যন্ত ৪১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির স্পন্সর ইকুইটি ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের সুদ, বিলম্ব এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের কারণে এখন সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ উৎপাদন শুরুর আগেই প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
বিএমএসআইএল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রকল্পটির ওপর তৈরি হওয়া প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার আর্থিক চাপের প্রধান খাতগুলো হলো—নিষ্পত্তিকৃত এলসির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিজনিত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা, বন্দর ড্যামেজ ও কনটেইনার ডিটেনশনসহ অন্যান্য ব্যয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকের সুদ ও আবগারি শুল্ক ৮৫৮ কোটি টাকা এবং ইউটিলিটি অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির আরেকটি বড় সমস্যা ছিল গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে এসব ইউটিলিটি অবকাঠামো স্থাপনের দায়িত্ব সরকার ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) হলেও বিএমএসআইএলকে এ খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
প্রথম পর্যায়ে ৫০ বছরের জন্য গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্দেশ্যে বসুন্ধরা প্রায় ২৯০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে। পরে ইউটিলিটি সংযোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বেজা পর্যাপ্ত অর্থ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে না পারায় বিএমএসআইএল নিজস্ব অর্থে অবকাঠামো নির্মাণে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে প্রায় ২৫০ কোটি, গ্যাস সংযোগে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি দৈনিক ৩ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন দেয়। বেজা ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ অনুমোদন করে। তবে সরবরাহ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো বিএমএসআইএলকেই নিজস্ব অর্থে নির্মাণ করতে হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দুবার টাকা দিয়েছি। একবার মেয়াদের জন্য, আরেকবার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। তারপরও এমন কারণে আমরা পিছিয়েছি, যা সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএম) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, একজন ব্যবসায়ীকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ তিনি দেখছেন না। তাঁর মতে, ডলারের দরের কারণে শিল্প খাতে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও বাড়তি দরে ডলার কিনতে হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নীতি প্রণয়নে ঘাটতি ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হয়নি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রভাবেও দেশীয় ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন।
তাঁর ভাষায়, অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন অনেক বেশি সংকটে রয়েছেন। তিনি মনে করেন, একটি প্রাণবন্ত অর্থনীতির জন্য বাজারে অর্থের স্বাভাবিক সঞ্চালন জরুরি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএমএসআইএল চালু হলে দেশের স্টিল খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড দেশে উৎপাদিত হলে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সরবরাহব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্পটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সরবরাহ শৃঙ্খলার সীমাবদ্ধতা, বন্দর জট এবং কাঁচামালের দামের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বছরে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
তাঁদের মতে, বড় শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় উদ্যোক্তারা যদি নীতিগত জটিলতা বা অনিশ্চয়তার কারণে বড় ধরনের লোকসানে পড়েন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও তা নেতিবাচক বার্তা দেবে। এতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল-এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহেদ জাহিদ বলেন, উন্নত ও নিম্ন-নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের লক্ষ্যেই প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় কম ব্যয়ে উচ্চমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কমিশনিংয়ের সময়ও ২০২৪ সালের শেষ থেকে পিছিয়ে ২০২৭ সালের শেষে নেওয়া হয়েছে।
শাহেদ জাহিদের ভাষায়, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও গ্রুপটি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। প্রতিটি অতিরিক্ত বিলম্ব প্রকল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে, আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল করছে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা—দুই পক্ষের ওপরই চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতার বিচারে বিএমএসআইএল শুধু একটি স্টিল কারখানা নয়; এটি দেশের শিল্পায়নের বড় একটি উদ্যোগ। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং জটিলতা, এলসি-সংক্রান্ত সমস্যা, বন্দর ড্যামেজ এবং ইউটিলিটি অবকাঠামোর বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অন্তত তিন বছর পিছিয়ে গেছে।
এদিকে বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এখন বড় প্রয়োজন বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর জটিলতা দূর করা, ব্যাংকিং ও এলসি ব্যবস্থাকে সহজ করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ একটি বড় শিল্প প্রকল্পের বিলম্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কর্মসংস্থান, রাজস্ব, উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে: সিইসি

0

চ্যালেঞ্জ থাকলেও আগের নির্বাচনের চেয়ে আরও ভালো স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস) আয়োজিত ‘স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ ফর বাংলাদেশ’স লোকাল গভর্নমেন্ট ইলেকশনস’ বিষয়ে এক্সেল এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ ডায়ালগ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় নির্বাচন কমিশনারগণ ও ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। আমাদের আগের নির্বাচনে যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, তার নিচে নামার কোনো সুযোগ নেই। বরং সম্ভব হলে আরও উন্নত করা হবে। এখন আশা করছি সবার কো-অপারেশন নিয়ে আমরা ভালো নির্বাচন করতে পারব, কোনো অসুবিধা হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচন কবে হবে, সেই দিনক্ষণ এখনই বলা যাবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিনক্ষণ আমরাই ঠিক করব। সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেব।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার জন্য আমরা কিছু আইন-কানুন ও বিধি-বিধান সংশোধন করতেছি। এজন্য এটা একটু সময় লাগবে। এজন্য কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ শেষ করে তা মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন আয়োজন শুধু নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে সিইসি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন।
এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভিন্ন প্রকৃতির এবং অতীতে এসব নির্বাচনে সহিংসতা তুলনামূলক বেশি হয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। এখানে ভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বটা একটু বেশি থাকবে। আশা করি আমরা সবাইকে নিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।
এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, নির্বাচন আয়োজনের সময় দুর্গাপূজা, বর্ষা ও বন্যার সম্ভাবনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগের মতো বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয় সমন্বয় করে উপযুক্ত সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হবে। তবে নির্বাচন অযথা বিলম্বিত হবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে এটা হয়ে যাবে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। বাসস।

দাউদপুরে একদিনের ‘মিনি উপজেলা’, সেবা পেলেন ৯ হাজার মানুষ

0


নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ  উপজেলা সদরে যেতে হবে না, বরং সরকারি সেবাই পৌঁছে যাবে মানুষের বাড়ির কাছাকাছি—এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সময়, অর্থ ও শারীরিক দুর্ভোগ কমাতে দাউদপুর ইউনিয়নের বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে একদিনের জন্য বসানো হয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত সেবা কেন্দ্র। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, কৃষি পরামর্শ, গবাদিপশুর চিকিৎসা, ভূমিসেবা—সবকিছুই মিলেছে একই স্থানে। প্রশাসনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেছেন।
রৌদ্রোজ্জ্বল সোমবার সকালে বেলদী ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের চেনা সরকারি দপ্তরের পরিবর্তে সেখানে সারি সারি বুথ। স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নির্বাচন অফিস, সমাজসেবা, ভূমি ও সমবায় অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ বুথে বসে সরাসরি সেবা দিচ্ছেন।
৫৫ বছর বয়সী ফালানি বেগমের জন্য এ উদ্যোগ ছিল বিশেষ স্বস্তির। বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম সংশোধনের জন্য উপজেলা সদরে যাওয়া তার পক্ষে কঠিন। তার ওপর যাতায়াতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও ছিল দুশ্চিন্তার। কিন্তু বাড়ির কাছেই সংশোধনসংক্রান্ত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তার সেই ভোগান্তি দূর হয়েছে।
শুধু ফালানি বেগম নন, দাউদপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার হাজারো মানুষ এদিন একইভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিয়েছেন। কারও জাতীয় পরিচয়পত্রের সমস্যা, কারও গবাদিপশুর চিকিৎসা, কেউ কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছেন। একদিনের জন্য ইউনিয়নটি যেন পরিণত হয়েছিল একটি ‘মিনি উপজেলা’য়।
উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, গত বছর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ট’ প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার এক হাজার তরুণ-তরুণীকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এবার দাউদপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন দপ্তর থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন।
বেলদী থেকে গরুর চিকিৎসা নিতে আসা আশরাফুজ্জান ফরিদ বলেন, ‘বাজান, বয়সতো আর কম অইলো না। এতোখানি বয়সে এমুন সুন্দর নিয়ম দেহি নাই। আমাগো দাউদপুর থেইক্যা প্রাণী অফিসো যাইতে দেড় ঘন্টা লাগবো। আবার ভাড়াও লাগে অনেক। বাড়ির কাছে এমুন সুযোগ পাইয়া উপকার অইছে। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় থাকা বেলদীর রাশিদা বেগমও এ উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকা বাড়ির কাছে সুযোগ পাইয়া ভালাই লাগতাছে।’কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব সফেদ আলীর ভাষায়, ‘বাজান, জীবনে অনেক কিছু দেখছি। তয় এতো সুন্দর কইরা উপজেলা প্রশাসন সেবা দিয়া গেলো এলাকায় আইয়া। এইডা জীবনে দেহি নাই।’ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাসভীর যোবায়ের বলেন, ‘আমার চাকরির ইতিহাসে এমনটা কোথাও দেখিনি। সাধারণত মানুষ উপজেলা কিংবা হাসপাতালে সেবা নিতে আসে। কিন্তু এখানে উপজেলার সব দপ্তর, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানুষের এলাকায় গিয়ে সেবা দিয়েছে।’ এ সময় রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন, সাধারণ সম্পাদক বাশিরউদ্দিন বাচ্চুসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে এ উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয়। তার পরিকল্পনায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্যও পৃথক বুথ স্থাপন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘দাউদপুর ইউনিয়ন একটি রিমোট এরিয়া। এখান থেকে উপজেলা কিংবা হাসপাতালে এসে সেবা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। কেউ শারীরিক অক্ষমতার কারণে আসতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে যাতায়াতে দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়। এ চিন্তা থেকেই সব দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা বুথ করা হয়েছে। যেন যার যে সমস্যা, তিনি সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারেন।’ তিনি জানান, দাউদপুর ইউনিয়ন দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এ ধরনের সেবা কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্বও কমেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা হবে।

শ্রম আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা জানতে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট

0

বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে শ্রম আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কেন সংবিধানের  মৌলিক অধিকার পরিপন্থী এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে হাইকোর্টের রুল।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের (Writ Petition No. 10819 of 2026) পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রোববার (২৩ আগস্ট ২০২৬) বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি এস. এম. ইফতেখার উদ্দিন মাহামুদ এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত রুল জারি করে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

রুলে বিবাদীদের প্রতি জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত, যার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্বে লিখিতভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৪ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।

আবেদনে বলা হয়েছে, উক্ত বিধানের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্বে লিখিতভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা শ্রম আইনের অধীন কোন ধরনের আইনি সুরক্ষা, সুবিধা, প্রাপ্তি ও প্রতিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ ও ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লাখ বেসরকারি খাতের কর্মী এই বিধানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা দেশের মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি। রিট আবেদনকারীগন বলছেন, এত বিশাল সংখ্যক নাগরিককে এভাবে আইনি সুরক্ষার বাইরে রাখা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৪৪ অনুচ্ছেদের আলোকে আইনের সমান সুরক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই বিধানের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বেসরকারি কর্ম কর্মজীবীকে  শ্রম আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে, ফলে তারা তাদের চাকরি সংক্রান্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো উপযুক্ত ফোরামই খুঁজে পাচ্ছেন না।

আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং তাকে সহযোগিতা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার, মাকসুদুর রহমান এবং মারুফ হাসান তমাল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ ও ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লাখ বেসরকারি খাতের কর্মী যা দেশের মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি, এই বিধানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হলে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদের বেসরকারি কর্মজীবীরা যেসব সুফল পেতে পারেন:-
আইনজীবীরা বলছেন, রুল যদি চূড়ান্তভাবে (absolute) মঞ্জুর হয় এবং আদালত শ্রম আইনের ধারা ২(৪৯)(খ) ও ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত অবৈধ ঘোষণা করেন, তাহলে বেসরকারি খাতের প্রায় ৬৫-৮০ লাখ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে চাকুরীরত কর্মজীবীগন নিম্নলিখিত সুরক্ষা ও সুবিধাগুলো পাবেন:
•কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম: শ্রম আইনের চতুর্থ অধ্যায় অনুযায়ী দৈনিক ও সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টার সীমা এবং নির্ধারিত হারে ওভারটাইম ভাতা পাওয়ার আইনি অধিকার পুনর্বহাল হবে, যা বর্তমানে এই শ্রেণির কর্মীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
ছুটি ও অবকাশ সুবিধা: বার্ষিক ছুটি (সবেতন), উৎসব ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির আইনি নিশ্চয়তা ফিরে পাবেন, যা বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তার একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
চাকরিচ্যুতি ও ক্ষতিপূরণ সুরক্ষা: অন্যায্য বরখাস্ত বা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা, যথাযথ নোটিশ পিরিয়ড, চাকরির স্থায়িত্বের ভিত্তিতে গ্র্যাচুইটি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকার পুনরুদ্ধার হবে।
মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা: নারী ব্যবস্থাপক, প্রশাসনিক ও তদারকি কর্মীরা সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সংশ্লিষ্ট সুরক্ষা আইনগতভাবে পুনরায় দাবি করতে পারবেন।
•বিরোধ নিষ্পত্তির উপযুক্ত ফোরাম: শ্রম আদালত ও শিল্প ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের অধিকার ফিরে পাবেন — যেখানে কোনো কোর্ট ফি লাগে না, বিচারক-শ্রমিক প্রতিনিধি-মালিক প্রতিনিধির ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় বিরোধ দ্রুত ও বিশেষজ্ঞভাবে নিষ্পত্তি হয় — যা সাধারণ দেওয়ানি আদালতের তুলনায় ঢের সহজলভ্য ও কম ব্যয়বহুল।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিল সুবিধা: প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ড, কল্যাণ তহবিল এবং শ্রম আইনের অধীন অন্যান্য আর্থিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বৈধ অধিকার নিশ্চিত হবে।

পোশাক, ব্যাংকিং, টেলিকম, ওষুধসহ ব্যাপক খাতে প্রভাব: তৈরি পোশাক খাতের ফ্লোর সুপারভাইজার ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলার থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতের মধ্যম সারির কর্মকর্তা, টেলিকম ও ওষুধ শিল্পের প্রশাসনিক কর্মী — এই রায়ের সুফল ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রায় প্রতিটি বেসরকারি খাতে, বিশেষত যারা লিখিত পদবি পেলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন না।

এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার বলেন, “অত্র মামলার বিষয়টি দেশের বেসরকারি কর্মজীবীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতের লাখ লাখ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি কর্মজীবী— যারা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানার কোনো অংশীদার নন, অথচ নিছক একটি লিখিত পদবির কারণে তাদের সমস্ত শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন — তাদের জন্য এটি আশার আলো। রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হলে এই বিশাল কর্মীগোষ্ঠী কর্মঘণ্টা, ছুটি, চাকরিচ্যুতি সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং সর্বোপরি শ্রম আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার পাবেন।”
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার, এডভোকেট বায়েজিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট রাসেল হোসেন, অ্যাডভোকেট মো. মাকসুদুর রহমান এবং অ্যাডভোকেট মারুফ হাসান তমাল যৌথভাবে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন ।
বিগত ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এবং কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) প্রধান পরিদর্শককে বিবাদী করে রিট পিটিশনটি দায়ের করা হয়।

চীনে বিয়ের নামে নারী পাচারের ফাঁদ, বাড়ছে উদ্বেগ

0

বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে নতুন জীবনের আশায় চীনে পাড়ি দেওয়া—কাগজে-কলমে এটি একটি বৈধ পারিবারিক অভিবাসন প্রক্রিয়া। কিন্তু এই বৈধ পথটিই যদি প্রতারণা, জবরদস্তি কিংবা নারী পাচারের কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত বিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে আন্তদেশীয় অপরাধের একটি গুরুতর ঝুঁকি।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে পারিবারিক পুনর্মিলনের কিউ–১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের যাওয়ার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে উঠে এসেছে এমন কিছু অভিযোগ, যেখানে বিদেশে বিয়ে, উন্নত জীবন, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা চীনে যাওয়ার সুযোগ দেখিয়ে নারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলোই যে সত্য, তা এখনই বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত ও আইনি যাচাই প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর ধরন এবং ভিসা নেওয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি—দুটিকে পাশাপাশি রেখে ঝুঁকিটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে।
শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—চীনা নাগরিককে বিয়ে করা মানেই প্রতারণা বা পাচার নয়। চীনে যাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশি নারীও পাচারের শিকার—এমন কোনো তথ্য নেই। একইভাবে কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো চীনা জনগোষ্ঠী, চীনা নাগরিক বা বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপানোর সুযোগ নেই।
তবে বৈধ বিয়ে এবং পারিবারিক ভিসার সুযোগকে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, সেই প্রশ্নটি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যাওয়ার জন্য কিউ–১ বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা নিয়েছেন। মানবপাচারবিষয়ক আইন নিয়ে আয়োজিত সাম্প্রতিক এক কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫।
পরের বছরই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬-তে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জন নারী এই ভিসায় চীনে যান।
এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি মানবপাচারের প্রমাণ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সংখ্যার এমন নাটকীয় বৃদ্ধি অবশ্যই অনুসন্ধানের দাবি রাখে। বিশেষ করে যখন এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে বিদেশে বিয়ে এবং উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের চীনে পাঠানোর অভিযোগ সামনে এসেছে।
রাঙামাটির একটি চাকমা পরিবারের অভিযোগ, তাদের এক তরুণীকে ঢাকায় এনে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির এক মারমা নারীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অন্য একটি ঘটনায় বাগেরহাটের এক তরুণীর অভিযোগ ছিল, তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন করার পর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরে তাকে চীনে পাঠানো হলে সেখানে তিনি নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কি কোনো সংঘবদ্ধ দালালচক্র বাংলাদেশি নারীদের আর্থিক দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা বিদেশে ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে?
মানবপাচারের অন্যতম পুরোনো কৌশল হলো মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করা। আর্থিকভাবে অনিশ্চিত পরিবারে বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব অনেক সময় একটি নতুন জীবনের দরজা হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতাকেই কাজে লাগাতে পারে পাচারকারী বা দালালচক্র।
কখনো বলা হয়, বিদেশে গেলে বড় বাড়িতে থাকা যাবে। স্বামী বিত্তশালী। সংসার হবে নিরাপদ। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। কোথাও আবার পরিবারের সদস্যদের অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চাকরি, স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস কিংবা উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের কথাও বলা হতে পারে।
বিভিন্ন অভিযোগ ও তদন্তে ভুয়া ঠিকানা, জাল নথি এবং সন্দেহজনক বিয়ের কাগজপত্র ব্যবহারের বিষয়ও উঠে এসেছে। কোনো কোনো ঘটনায় মধ্যস্থতাকারীরা নারীকে চীনে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে—এই বিয়েগুলো আসলে কতটা যাচাই করা হচ্ছে?
বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রী—উভয়ের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আয় ও পারিবারিক তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নারীটি নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছেন কি না এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি জানেন কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি এখন আর শুধু বড় সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, ওষুধ, প্রযুক্তি ও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন খাতে চীনা কোম্পানি ও বিনিয়োগের উপস্থিতি বাড়ছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের চলাচল, অর্থের লেনদেন এবং স্থানীয়-বিদেশি যোগাযোগও বাড়বে।
কিন্তু বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে অপরাধী চক্র যাতে সুযোগ নিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো এবং বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি শিথিল করা এক বিষয় নয়। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক কে, প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, অর্থের উৎস ও গন্তব্য কী এবং স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীরা কারা—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। এই নীতি শুধু চীনের জন্য নয়; বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে মাদক, সাইবার জালিয়াতি এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। গত মার্চ মাসে উত্তরা এলাকায় একটি অস্থায়ী কেটামিন তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা প্রায় ৬ দশমিক ৩ কেজি কেটামিন উদ্ধারের কথা জানান এবং আন্তর্জাতিক মাদক নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। অন্য কিছু ঘটনায় অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধের অভিযোগে বিপুলসংখ্যক সিম কার্ড ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের খবরও এসেছে। তবে এসব ঘটনার বিচারও হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কারণে বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করা অসংখ্য চীনা কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবু রাষ্ট্রের জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—আন্ত:দেশীয় অপরাধের ধরন যখন বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছে? বিদেশি বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের ঝুঁকি বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও লাওসের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর নারীদের প্রতারণা কিংবা জোরপূর্বক চীনে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

এই ধরনের অপরাধের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, দুর্বল জন্মনিবন্ধন ও পরিচয় যাচাইব্যবস্থা, সীমান্তে নজরদারির ঘাটতি এবং শক্তিশালী দালালচক্র—সব মিলিয়ে শোষণের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

চীনের কিছু অঞ্চলে নারী ও পুরুষের সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে এটিকে অপরাধের সরল কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনসংখ্যাগত বাস্তবতা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধে বাধ্য করে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।

মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো রয়েছে। নতুন আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাইয়ের জন্য একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি তৈরির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়।

পুলিশ, সিআইডি, বিশেষ শাখা, ইমিগ্রেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে বিদেশে যাচ্ছেন—এই তথ্য যদি সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার কাছে থাকে, তাহলে অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে বিয়ে নিবন্ধনকারী বা কাজির কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে। কেউ জেনেশুনে জাল কাগজপত্র বা প্রতারণামূলক বিয়েতে সহায়তা করলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।
আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানবপাচারের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ একাধিক ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্থানান্তর হতে পারে। তাই ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

মানবপাচার প্রতিরোধের নামে বিদেশগামী সব নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা কোনো সমাধান হতে পারে না।

বাংলাদেশি নারীদের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে কিংবা পারিবারিক কারণে বিদেশ যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার অযথা সীমিত করা উচিত নয়। বরং বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশনে নজরদারি হওয়া উচিত নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও তথ্যের ভিত্তিতে।

বিয়ের কাগজপত্রে অসামঞ্জস্য আছে কি না, যাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি সন্দেহজনক কি না, ভ্রমণ পরিকল্পনায় অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না কিংবা যাত্রী ভয়, চাপ বা জবরদস্তির মধ্যে আছেন কি না—এ ধরনের আলামত শনাক্ত করতে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

লক্ষ্য হওয়া উচিত নারী হওয়ায় কাউকে থামানো নয়; বরং সম্ভাব্য পাচারের নির্দিষ্ট লক্ষণ শনাক্ত করা।

বাংলাদেশি কোনো নারী চীনে গিয়ে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হলে বাংলাদেশের একার পক্ষে সব তথ্য সংগ্রহ করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

বিয়ের নথি, স্বামীর পরিচয়, বসবাসের ঠিকানা, ব্যাংক লেনদেন কিংবা সংশ্লিষ্ট দালালদের বিষয়ে তথ্য জানতে হলে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন।

তাই চীনের সহযোগিতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, অর্থের গতিপথ অনুসরণ, ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে।

বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস এর আগে অবৈধ ‘ম্যাচমেকিং’ এবং বিদেশি স্ত্রী ‘কেনার’ মতো কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এই অবস্থানকে শুধু বিবৃতি বা সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সহযোগিতা ও সমন্বিত পদক্ষেপে রূপ দেওয়া প্রয়োজন।

নারী পাচার প্রতিরোধের প্রথম ধাপ অনেক সময় পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে।
বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব এলে পরিবারের সদস্যদের জানতে হবে—পাত্র আসলে কে, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কোথায়, তিনি আগে বিবাহিত কি না, তাঁর পেশা ও আয় কী এবং বিয়ের ব্যবস্থা করছে কারা।
একই সঙ্গে ভিসার আবেদন কীভাবে করা হয়েছে এবং বিদেশে যাওয়ার পর কোথায় থাকা হবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন।
নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও গোপনীয় পরামর্শব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। সেখানে তারা পারিবারিক বা সামাজিক চাপের বাইরে নিজেদের বিদেশযাত্রা ও বিয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শ নিতে পারবেন এবং সম্ভাব্য প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারবেন।
সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
চীনে যাওয়ার জন্য ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারীর কিউ–১ ভিসা নেওয়ার তথ্যকে মানবপাচারের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই নারীদের মধ্যে কতজন পাচারের শিকার হয়েছেন, সেই সংখ্যাটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে ভিসা নেওয়ার সংখ্যায় যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে এবং একই সময়ে বিদেশি বিয়ের আড়ালে প্রতারণা ও নির্যাতনের যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখেও থেমে থাকা যায় না।
বাংলাদেশের এখনই বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়াও স্বাভাবিক।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা, নিজস্ব আইন কিংবা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে হবে।
বরং সম্পর্ক যত গভীর হবে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের ভিসার মতো একটি বৈধ অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন জরুরি। কারণ সতর্কতার অভাবের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হতে পারে কোনো একটি পরিবারকে; যারা হয়তো মেয়েকে বিদেশে বিয়ে দিয়ে নতুন জীবনের আশায় বিদায় জানিয়েছিল, কিন্তু আর কখনো তার ফিরে আসা দেখেনি।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন

0

 


রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।শনিবার  সকাল ১০টা ২৭ মিনিটে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে এ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছু সময় তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এরপর তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন-বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
পরিদর্শন-বইয়ের মন্তব্যে তিনি লেখেন, ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, অসীম সাহস ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি- স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।’
তিনি লেখেন, ‘এই পবিত্র জাতীয় স্মৃতিসৌধ- আমাদের জাতীয় গৌরব, আত্মত্যাগ, ঐক্য ও দেশপ্রেমের চিরন্তন স্মারক, যা চিরকাল দেশপ্রেম ও দেশগঠনে অনুপ্রেরণা জোগাবে।’
আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করছি। তাঁদের দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।’
তিনি আরো লেখেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের আদর্শ এবং বীর শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা সমুন্নত রেখে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।’
সবশেষে তিনি লেখেন, মহান আল্লাহতায়ালা বীর শহীদদের রুহের মাগফিরাত দান করুন। এবং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের ওপর অব্যাহত শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বর্ষণ করুন। আমিন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’
এরপর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি উদয় পদ্ম বৃক্ষের চারা রোপণ শেষে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গন ত্যাগ করেন।
এর আগে রাষ্ট্রপতি জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান।
এ সময় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, রাষ্ট্রপতি কার্যলয়ের সামরিক সচিব জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন, জন বিভাগের সচিব এ জে এম সালাহউদ্দিন নাগরী, প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এবং সাভার ক্যান্টনমেন্টের জিওসি উপস্থিত ছিলেন। বাসস।

ছানি অপারেশন ক্যাম্প পরিদর্শনে ডা. জুবাইদা রহমান

0

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান শনিবার প্রধান অতিথি হিসেবে বিনামূল্যে ছানি অপারেশন ক্যাম্প উদ্বোধন করেছেন। এ সময় তিনি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

জেডআরএফ এবং আল বাশার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর ভাষানটেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।জেডআরএফ-এর পরিচালক প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম জানান, ক্যাম্পে প্রায় এক হাজার জনের চক্ষু চিকিৎসা, ওষুধ ও চশমা প্রদান করা হয়। এই ক্যাম্পে যাদের ছানি অপারেশন প্রয়োজন তাদের বাছাই করে পরবর্তী চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়া হয়। জেডআরএফ-এর নির্বাহী পরিচালক ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, জেডআরএফ-এর পরিচালক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, জেডআরএফ-এর পরিচালক প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম, পরিচালক কৃষিবিদ ড. মাহফুজুল হক বাচ্চু, পরিচালক প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম, আল বাশার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাগণ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

কূটনীতিতে আবেগ নয়, বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে; আলোচনার টেবিলেই সমাধান

0

 

 

ছয় মাসের পথচলায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুর সঙ্গেই ভারত সম্পর্কিত। ফলে আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই এ সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সেই কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে টিকে থাকতে বা এগিয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি। অর্থাৎ কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচ্য হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ। যে সম্পর্ক দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, বাংলাদেশকে সেই সম্পর্কই এগিয়ে নিতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাস্তব সত্য হলো—প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেমন সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, তেমনি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথও প্রশস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তাই অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের কারণে ভারতকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক কখনো উষ্ণ হয়েছে, কখনো আবার নানা কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর একই বছরের ২১ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের আমন্ত্রণে ভারত সফর করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ভারত সফর নিয়ে নিজ সরকারের ভেতরেও ভিন্নমত ছিল। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই সফরের ধারাবাহিকতায় গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে যে চুক্তি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের পানিস্বার্থের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। জাপান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জনশক্তি রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি—সবকিছুর পেছনেই ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তিনি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। অর্থাৎ কোনো একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতেও একই ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরই তিনি ভারত সফর করেন। ২০০৬ সালেও তিনি ভারত সফর করেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ২০১২ সালে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তাঁর ভারত সফর। সাত দিনের ওই সফরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন এবং দেশটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সম্মান পান।
সে সময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকদের একটি অংশ এবং দলের ভেতরের অনেকে ভারত সফর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক চাপের পরিবর্তে নিজের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে সফরটি করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, বিএনপি ভারতবিরোধিতার রাজনীতি করে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তিনি তখনও উপলব্ধি করেছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সেই বাস্তববাদী কূটনৈতিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবে এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাঁর সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জায়গাতেই, যেখানে আবেগ, রাজনৈতিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
দুঃখজনকভাবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নানা অসংগতি তৈরি হয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের স্বার্থের চেয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছিল। ‘বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে’—এমন প্রত্যাশার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশের কোনো দৃশ্যমান লাভ হয়নি। বরং বাণিজ্য, ভিসা, সীমান্ত, যোগাযোগ এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভারতবিরোধী বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ভারতের সঙ্গে ‘অসম চুক্তি’ বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে বড় ধরনের কোনো চুক্তি বাতিল হয়নি। একইভাবে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ পায়নি। চীন সফরের সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে ড. ইউনূসের মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছিল। একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের বক্তব্য প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হলে তার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের বক্তব্যের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ভারত বাংলাদেশের পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। ভিসা কার্যক্রমও দীর্ঘ সময় কার্যত সীমিত ছিল। চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রয়োজনে ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের ভোগান্তি বাড়ে। সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা সাধারণ মানুষের কোনো স্থায়ী সুবিধা তৈরি হয়নি। এমনকি দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনেও পড়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া দেশের ক্রীড়া ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের একটি প্রতিবেশী সম্পর্কের অবনতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও প্রশ্ন তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি পরিবর্তনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশে এসে শোক ও সমবেদনা জানান। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরালার উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এরপরও বিভিন্ন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সুযোগ—দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে আস্থা তৈরি করার। ভারতের পক্ষ থেকে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া এবং ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত বহন করে। জ্বালানি সংকটের সময় ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের সংকট তৈরি হলে ভারত থেকে আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাজার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। এসব ছোট ঘটনা হলেও এগুলো দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের পোশাক ও উৎপাদন খাতের বিভিন্ন শিল্পে তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, রং, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের কাঁচামাল ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে এসব পণ্য দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে আনা সম্ভব। সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প হিসেবে চীন বা দূরবর্তী কোনো বাজার থেকে পণ্য আনতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, সময় বেশি লাগবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি মজুত রাখতে হবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পড়বে। বাংলাদেশের শিল্পের একটি বড় সুবিধা হলো ভৌগোলিক অবস্থান। সড়ক, রেল, নৌপথ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারেও প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের অবনতি হলে এসব সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পানিবণ্টন, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ট্রানজিট, নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। ভারত বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশও ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্পর্কটি একতরফা নির্ভরতার নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করার সুযোগ রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান, মানব পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে তথ্য ও সহযোগিতা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। এই সহযোগিতা দুর্বল হলে উভয় দেশই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের সব বিষয়ে ভারতের সঙ্গে একমত হতে হবে। সীমান্তে হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য, পণ্যবাজারে বিধিনিষেধ কিংবা যেকোনো অসম চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস না করেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। বরং কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য এখানেই—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশের সামনে তাই ভারতকে বেছে নেওয়া অথবা অন্য কোনো শক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ সব অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করা যায়। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত অর্থও সেটিই। এই বাস্তবতার বিপরীতে দেশের ভেতর থেকে যদি কেউ সরকারকে অতিরিক্ত ভারতবিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দিতে চায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। একটি দেশের সঙ্গে একটি বা একাধিক বিষয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু একটি ইস্যুর কারণে সব ধরনের আলোচনা ও সহযোগিতার দরজা বন্ধ করে দেওয়া কোনো বিচক্ষণ কূটনীতি হতে পারে না। ভারতবিরোধী মনোভাবকে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হাতিয়ার বানানোর ঝুঁকিও কম নয়। অতিরিক্ত সংঘাতমূলক অবস্থান রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একটি পক্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে। বিএনপি একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। তাই দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতেও বাস্তববাদ, ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। ভারতবিরোধিতা দিয়ে নয়, বাংলাদেশের স্বার্থ আদায় করার সক্ষমতা দিয়েই সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য বিচার করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির ধারাকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করে এগিয়ে নিতে পারেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া সম্ভব। আলোচনার টেবিলেই পানির হিস্যা, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরতে হবে। কূটনীতিতে মান-অভিমান কিংবা জেদের কোনো স্থায়ী মূল্য নেই। রাষ্ট্রের স্বার্থই সেখানে শেষ কথা। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তারেক রহমানের ভারত সফর করা উচিত কি না—এই প্রশ্নের উত্তরও রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চায়, যেখানে কোনো দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নেই, আবার অকারণ বৈরিতাও নেই। যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন এখানেই। দেশের জনগণের প্রত্যাশা—তিনি কোনো পক্ষের চাপ বা আবেগের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবেন। শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই বাংলাদেশের স্বার্থ সবচেয়ে শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে। আর সেই সিদ্ধান্তই হবে প্রকৃত অর্থে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনীতির প্রতিফলন।